জুরাসিক যুগের মুখরোচক শিকার 

জুরাসিক যুগের মুখরোচক শিকার 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

জুরাসিক যুগকে কল্পনা করলে প্রথমেই আমাদের চোখে অতিকায়, দীর্ঘগ্রীব সোরোপড ডাইনোসরের ছবিই ভেসে ওঠে। একসময় এদের মন্থরগতি অরণ্য পদচারণায় কেঁপে উঠত ভূমি। কিন্তু এই মহাকায় দৃশ্যের নীচে লুকিয়ে ছিল এক নির্দয় বাস্তবতা। সেই সময় পৃথিবীতে জীবন ছিল সস্তা, আর শৈশব ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়। সম্প্রতি এক গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, জুরাসিক বাস্তুতন্ত্রে শিশু সোরোপডরা ছিল সহজলভ্য ও প্রিয় খাদ্য—প্রায় আজকের মুচমুচে আলুভাজার মতো। উত্তর আমেরিকার মরিসন স্তরবিন্যাস থেকে সংগৃহীত জীবাশ্ম তথ্যের বিশ্লেষণ থেকে এরকমই একটা উপসংহারে আসা গেছে।

মরিসন স্তরবিন্যাস হলো পরবর্তী জুরাসিক যুগের এক বিস্তৃত এবং উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে উর্বর জীবাশ্মভাণ্ডার। আজকের যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঙ্গরাজ্য জুড়ে তার বিস্তার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখান থেকে আবিষ্কৃত ডাইনোসর জীবাশ্ম, জীবাশ্মবিদদের মুগ্ধ করে এসেছে। কিন্তু সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ক্যাসিয়াস মরিসনের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই জীবাশ্মগুলোকে দেখেছেন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাঁরা আলাদা আলাদা প্রজাতির তালিকা না বানিয়ে ,নির্মাণ করেছেন একটি সম্পূর্ণ খাদ্যজাল। সেখানে পরিষ্কার ধারণা ফুটে উঠেছে- কে কাকে খেত, আর কে কার ওপর নির্ভর করত ইত্যাদি ইত্যাদির।

গবেষকরা ডাইনোসরের দাঁতের ক্ষয়চিহ্ন, হাড়ের রাসায়নিক গঠন এবং এমনকি জীবাশ্মে সংরক্ষিত শেষ খাবারের অবশেষ বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে শিকার-শিকারির সম্পর্ক পুনর্গঠন করেন। তাঁদের গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে নিউ মেক্সিকো মিউজিয়াম অফ ন্যাচরাল হিস্ট্রি অ্যান্ড সায়েন্স বুলেটিন-এ।

এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদ্যোজাত বা কচি সোরোপডরা ছিল বহু শিকারির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যউৎস। পূর্ণবয়স্ক সোরোপডরা প্রায় অজেয়; কিন্তু তাদের বাচ্চারা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। জন্মের সময় তাদের আকার ছোট, তাদের চলাফেরা ধীরগতি এবং তারা প্রায় পুরোপুরি অরক্ষিত। বিশাল দেহের কারণে বাবা-মায়ের পক্ষে ডিম পাহারা দেওয়া বা ছানাদের রক্ষা করা কার্যত অসম্ভব ছিল। আধুনিক কচ্ছপের মতোই, বাচ্চাদের জন্মের পরপরই প্রকৃতির হাতে সঁপে দেওয়া হতো।

এই শূন্যস্থানই পূরণ করত জুরাসিক যুগের শিকারি প্রাণীরা। অ্যালোসোরাস-এর মতো মাংসাশী ডাইনোসরদের জীবনধারণ অনেকটাই নির্ভর করত এই শিশু সোরোপডদের ওপর। গবেষকদের ভাষায়, “এই বাস্তুতন্ত্রে জীবন ছিল সস্তা”—অগণিত প্রাণ জন্মাত, অগণিত প্রাণ হারিয়ে যেত, আর সেই প্রবাহই সচল রাখত পুরো ব্যবস্থাকে।

গবেষণাটি এক দীর্ঘ বিবর্তনী পরিণতির দিকে ইঙ্গিত দেয় । প্রায় ৭ কোটি বছর পর সোরোপডদের সংখ্যা কমে গেলে খাদ্যজালে চাপ তৈরি হয়। সেই চাপই হয়তো প্রকৃতিকে ঠেলে দেয় আরও বড়, আরও শক্তিশালী শিকারির দিকে—যাদের শক্ত কামড় ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পরবর্তী কালের টাইরানোসোরাস রেক্স (টি.রেক্স) -এর মতো কিংবদন্তির জন্ম দেয়।

জুরাসিক যুগ শুধু দৈত্যদের শাসনের গল্প নয়। এটি ছিল এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যপূর্ণ, অথচ নিষ্ঠুর পৃথিবী। যেখানে বিশালতার পেছনে লুকিয়ে থাকত অসংখ্য ক্ষুদ্র জীবনের চরম মূল্য।

 

সূত্র: Baby Sauropods Were the Potato Chips of the Jurassic Era

“Life was cheap in this ecosystem” BY JAKE CURRIE, published in New Mexico Museum of Natural History and Science Bulletin, 2nd February, 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × five =