জ্যোতিষ্কলোকের নক্ষত্র : সুব্রমণিয়ান চন্দ্রশেখর

জ্যোতিষ্কলোকের নক্ষত্র : সুব্রমণিয়ান চন্দ্রশেখর

আশীষ লাহিড়ী
Posted on ১০ জানুয়ারী, ২০২৫

বুড়ো হলে মানুষের শক্তি কমে আসে, শেষ পর্যন্ত মানুষ মারা যায়। কিন্তু বুড়ো হলে আকাশের তারকাদের কী হয়? বুড়ো হলে তারকারা নিজের ভারেই নুয়ে পড়ে ঘন আর ছোটো হয়ে যায় বলে তাদের বলে শ্বেত বামন, ইংরিজিতে white dwarf. তখন তাদের ভর সূর্যেরই মতন, কিন্তু সাইজ হয় আমাদের এই ছোট্টো পৃথিবী গ্রহটারই মতো। কিন্তু সব তারকাই বুড়ো হলে শ্বেত বামনে পরিণত হয় না। যেসব তারকার ভর সূর্যের চেয়ে প্রায় দেড় (১.৪৪) গুণ বেশি, সেগুলো বয়সকালেও শ্বেত বামন হয় না। ওই ১.৪৪ গুণ ভরটা হল একটা সীমা। ওই সীমাটাই ঠিক করে দেয় বুড়ো বয়সে কোন তারকার পরিণতি কী হবে। এরই নাম চন্দ্রশেখর সীমা। বুড়ো একটা শ্বেত বামনের ভর যদি ওই চন্দ্রশেখর সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সেগুলো আরও ঘন হয়ে, আরও ছোটো হতে হতে শেষ পর্যন্ত ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বরে পরিণত হয়। চন্দ্রশেখরের এই আবিষ্কার একটা দিক্‌চিহ্ন।
এই সুব্রমণিয়ান চন্দ্রশেখর (১৯১০-১৯৯৫) হলেন আমাদের চেনা মানুষ সি ভি রামণ-এর ভাইপো। সারা বিশ্ব তাঁকে ভালোবেসে চন্দ্র বলে ডাকে। কাকা-ভাইপো দুজনেই নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। কাকা ১৯৩০ সালে, ভাইপো ১৯৮৩ সালে। চন্দ্র ১৯৩৫-এ ইংল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞান সভায় তাঁর তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে এক বক্তৃতা দেন। সেখানে তাঁর গুরু-স্থানীয়, তিপ্পান্ন বছরের প্রবীণ আর্থার এডিংটন সেই তত্ত্বর প্রবল বিরোধিতা করে একটা পালটা মডেল হাজির করলেন। এডিংটনের মতে সব তারকাই বুড়ো হলে শ্বেত বামনে পরিণত হয়। অবশেষে ১৯৩৯ সালে প্রমাণিত হল, চন্দ্রই ঠিক, এডিংটন যতবড়ো বিজ্ঞানীই হোন, এক্ষেত্রে তিনি ভুল। ১৯৩৯ সালে ঊনত্রিশ বছর বয়সে যে-গবেষণা করেছিলেন, তার জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেন ১৯৮৩ সালে, তিয়াত্তর বছর বয়সে! স্বভাবতই খুব খুশি হননি তিনি। তবে নোবেল পুরস্কার ছাড়াও অজস্র সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন চন্দ্র। ১৯৭৯ সালে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসা তার প্রধান চারটি মানমন্দিরের একটির নাম দেয় ‘চন্দ্রশেখর’। ১৯৯৯ সালে কলম্বিয়া মহাকাশযানের সঙ্গে পাঠানো হয় ‘চন্দ্র এক্স-রে মানমন্দির’।
নিখাদ বিজ্ঞানের বাইরেও চন্দ্রর দুটি বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ ছিল। এক, শিল্পসাহিত্য-সংগীত; দুই, নাস্তিকতা। নোবেল পুরস্কার নেওয়ার সময় তিনি ইংরেজিতে রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন। ওই কবিতার শেষ লাইনে আছে: ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত। কিন্তু স্বর্গ (heaven) কথাটি উচ্চারণ করতে তাঁর এতই আপত্তি যে তিনি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির কাছে ক্ষমা চেয়ে স্বর্গের বদলে আশ্রয় (haven) শব্দটি বসান। তাঁর একটি উক্তি প্রবাদ হয়ে রয়েছে: “ঈশ্বর মানুষকে তৈরি করেননি, মানুষই ঈশ্বরকে তৈরি করেছে”।

 

**এই ছবিটি আগে ভুল ছাপা হয়েছিল বলে আমরা লজ্জিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight + 13 =