টি-রেক্সের ধীরে বেড়ে ওঠার রহস্য

টি-রেক্সের ধীরে বেড়ে ওঠার রহস্য

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬

টি-রেক্স মানেই যে ঝড়ের গতিতে বেড়ে উঠেছে, তা কিন্তু নয়। ধীরে ধীরে, প্রায় চার দশক ধরে এরা বড় হয়। মানে, পূর্ণ আকারে পৌঁছাতে তাদের লাগে প্রায় ৪০ বছর। আগে যা ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়ে এ সময় অনেক বেশি। নতুন এক বিশ্লেষণ করা হয়েছে ১৭টি টাইরানোসরের পায়ের হাড়ের জীবাশ্ম খুঁটিয়ে দেখে। ছোট কিশোর থেকে শুরু করে প্রকাণ্ড প্রাপ্তবয়স্ক, সবাই আছে এই তথ্য সেটে। গবেষকেরা হাড়ের ভিতরের সূক্ষ্ম বৃদ্ধি-চিহ্ন খুঁজে বের করতে ব্যবহার করেছেন উন্নত আলোক-প্রযুক্তি আর আধুনিক পরিসংখ্যান। ফলে আগের যেকোনো গবেষণার চেয়ে এই বিশ্লেষণ বেশি পূর্ণাঙ্গ। বেশি বাস্তবসম্মত এক জীবনচিত্র পাওয়া গেছে এ থেকে। ডাইনোসরের বয়স নির্ধারণ সাধারণত করা হয় হাড়ের ভিতরের বার্ষিক বৃদ্ধি-বলয় গুণে, গাছের কাণ্ডের বার্ষিক বলয়ের মতোই। টি-রেক্সের ক্ষেত্রে এই বলয়গুলো বেশি স্পষ্ট থাকে পায়ের হাড়ে। এগুলি দেখে বোঝা যায় প্রাণীটি কত দ্রুত বড় হয়েছে, আর মৃত্যুর সময় তার বয়স কত ছিল। কিন্তু এখানেই বড় সমস্যা। টি-রেক্সের হাড় কোনো অটুট ডায়েরি নয়। জীবনের সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ভিতরের গঠন বদলায়। পুরোনো অংশ ক্ষয় হয়, নতুন অংশ তৈরি হয়। ফলে শুরুর দিকের অনেক বৃদ্ধি-চিহ্ন মুছে যায় বা ঝাপসা হয়ে পড়ে। তাই অধিকাংশ জীবাশ্মে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে কেবল জীবনের শেষ দিকেরই ইতিহাস। এই সীমাবদ্ধতার কারণেই বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ভেবে এসেছেন, টি-রেক্স প্রায় ২৫ বছরেই বেড়ে উঠত। নতুন গবেষণা এই ঘাটতিটা ধরতে পেরেছে একটি নয়, অনেকগুলো জীবাশ্ম একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে। প্রতিটি হাড় আলাদা। কোনোটা শৈশব দেখায়, কোনোটা যৌবন, কোনটা আবার শেষ অধ্যায়। সব দৃশ্য জুড়ে দিয়ে গবেষকেরা তৈরি করেন একটি সামগ্রিক বৃদ্ধি-বক্ররেখা। “এটাই এখন পর্যন্ত টি-রেক্স নিয়ে সবচেয়ে বড় ডেটাসেট,” বলছেন প্রধান গবেষক হলি। গবেষকেরা আরও দাবি করছেন, আগের অনেক গবেষণায় কিছু বৃদ্ধি-চিহ্ন চোখ এড়িয়ে গেছে অনেকেরই। জীবাশ্মের খুব পাতলা স্লাইস বিশেষ ধরনের আলো সার্কুলার আর ক্রস-পোলারাইজড আলোর নীচে পরীক্ষা করা হয়। এতে এমন সূক্ষ্ম রিং ধরা পড়ে, যা সাধারণ পদ্ধতিতে দেখা যায় না। এর প্রভাব বিশাল। যদি রিং কম গোনা হয়, বছরও কম ধরা পড়ে। আর বছর কম মানেই প্রাণীটাকে ভুলভাবে “দ্রুত-বড়-হওয়া” দানব বানিয়ে ফেলা। পরিসংখ্যানবিদ ও প্রত্ন-জীববিজ্ঞানী নাথান মাইরভোল্ডের নেতৃত্বে দলটি নতুন এক মডেল ব্যবহার করে। একক কোনো জীবাশ্মকে দিয়ে পুরো জীবনকাহিনী না বানিয়ে তারা বিভিন্ন নমুনার তথ্য জোড়া দিয়ে বানান একটি যৌথ বৃদ্ধি-পথ। এই বক্ররেখা দেখাচ্ছে, টি-রেক্স আসলে অনেক ধীরে, অনেক স্থির গতিতে বেড়েছে। নতুন টাইমলাইনে দেখা যাচ্ছে, টি-রেক্স-এর ওজন প্রায় ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত বাড়তে থাকত, শেষে গিয়ে পৌঁছত প্রায় আট টনের কাছাকাছি। তবে সবাই একরকম ছিল না। কেউ একই বয়সে আকারে বড়, কেউ ছোট। এটা স্বাভাবিক জৈব বৈচিত্র্য কিংবা হয়তো পরিবেশ আর খাবারের তারতম্য-এর ফল। সুতরাং টি-রেক্স হঠাৎ শীর্ষ শিকারি হয়ে ওঠা এক দানব নয়, বরং ধাপে ধাপে ক্ষমতা অর্জন করা এক প্রাণী। সহলেখক জ্যাক হর্নারের মতে, “এই দীর্ঘ সময় ধরে বেড়ে ওঠার ফলে কমবয়সি টাইরানোসররা পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল। আর সেটাই হয়তো ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষে তাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিকারিতে পরিণত হওয়ার বড় কারণ।“ সংক্ষেপে বললে, টি-রেক্সের গল্প এখন আর স্প্রিন্ট নয়, এটা একটা দীর্ঘ ম্যারাথন।

 

সূত্র : Prolonged growth and extended subadult development in the Tyrannosaurus rex species complex revealed by expanded histological sampling and statistical modeling.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − 12 =