ডায়াবেটিস মানুষের জীবনকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। কিন্তু এখন, জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ডায়াবেটিস চিকিৎসায় এক চমৎকার অগ্রগতির দাবি করেছেন। তাঁরা বলেছেন স্টেম সেল ব্যবহার করে অগ্ন্যাশয়ের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
স্টেম সেল হল মানবদেহের সেই “আদি সেল’’, যা উপযুক্ত পরিবেশে যেকোনো বিশেষায়িত কোষে রূপ নিতে পারে। গবেষণাটির মূল কৌশল ছিল ভ্রূণজাত স্টেম সেলকে ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরিবেশে রেখে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা, যাতে তারা অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়াটি প্রাকৃতিক অগ্ন্যাশয় বিকাশের ধাপগুলিকেই অনুকরণ করে। ফলে তৈরি হওয়া কোষগুলো স্বাভাবিক বিটা কোষের মতোই গ্লুকোজের উপস্থিতি বুঝতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইনসুলিন নিঃসরণ করে। প্রতিস্থাপনের পর এই কোষগুলো দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকে বলেও দাবি করা হয়েছে।
দেখা গেছে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা, যারা এতদিন ইনসুলিন ইনজেকশন ছাড়া বাঁচতেই পারতেন না, এখন তাদের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই ইনসুলিন তৈরি হচ্ছে। একইভাবে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, ওষুধ ছাড়াই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্থিতিশীল রয়েছে। অর্থাৎ, বোঝা গেল স্টেম সেল থেকে তৈরি কার্যকর বিটা কোষ প্রতিস্থাপন করে শরীরে ইনসুলিন উৎপাদনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এরপর একটা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়। সেটায় অংশগ্রহণকারী ১৭ জন রোগীর শারীরিক অবস্থাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জীবন্ত প্রমাণ। দেখা গেছে প্রতিস্থাপনের দুই বছর পরও তারা ডায়াবেটিসমুক্ত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তাদের শরীর এইসব নতুন কোষকে প্রত্যাখ্যান করেনি, কারণ এগুলো তৈরি হয়েছে তাদের নিজের স্টেম সেল থেকেই। ফলে নেই কোনো স্ববিরোধী অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া, নেই আজীবন ইমিউনোসাপ্রেশন ওষুধের বোঝা। দেখা গেছে রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা সারাদিন স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকছে। পাশাপাশি ডায়াবেটিসের কারণে কিডনির ক্ষতি কমছে এবং চোখের সমস্যাকেও সামাল দেওয়া যাচ্ছে। এগুলোই এই চিকিৎসার ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব নির্দেশ করে। ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে এটা একটা সাফল্য ঠিকই, তবে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে কিছু বাধা এখনও রয়ে গেছে। এই চিকিৎসা প্রস্তুত করতে সময় লাগে কয়েক মাস, আর খরচও অত্যন্ত বেশি, প্রায় ৫ লক্ষ মার্কিন ডলার । বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এই স্টেম সেল প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির ফলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই খরচ অনেকটাই কমে আসবে। তখন খুব শিগগিরই এই পদ্ধতি সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হয়ে উঠবে।
যদি সেই দিন সত্যিই আসে, তবে ডায়াবেটিস আর সারা জীবনের বোঝা হয়ে থাকবে না। বরং আর পাঁচটা সাধারণ রোগের মতোই তা একদিন প্রতিরোধযোগ্য হবে। এই গবেষণা যদি বৃহত্তর পরিসরে সফল হয়, তবে সেটিই হবে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় এটি এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন। সেক্ষেত্রে রোগ নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সম্পূর্ণ নিরাময়ই হবে প্রধান লক্ষ্য।
সূত্র: Osaka University, The Lancet 2025
