ডায়েটিং-এর দীর্ঘমেয়াদি উপকারিতা 

ডায়েটিং-এর দীর্ঘমেয়াদি উপকারিতা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ এপ্রিল, ২০২৬

ডায়েটিং বা খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকার প্রয়োজন। ডায়েটিং বা নিয়ন্ত্রিত খাদ্যতালিকা হল কোনো ব্যক্তি বা জীবের স্বাস্থ্য ও দেহের পৌষ্টিক চাহিদা অনুযায়ী মোট, ধারাবাহিক এবং অভ্যাসগত খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ। অনেক ক্ষেত্রেই এই তালিকা শরীরের নির্দিষ্ট ওজন বজায় রাখার লক্ষ্য পূরণের জন্য তৈরি করা হয়। আমরা প্রতিদিন যা খাই তাকেই বলে ডায়েট, শুধু সাময়িক বিধিনিষেধকে নয়। ডায়েট সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুব আবছা। তাই আমরা প্রায়ই ভাবি, ডায়েট শুরু করার কিছুদিন পর যদি ওজন আবার বাড়ে, তবে সেই প্রচেষ্টা একেবারেই ব্যর্থ। কিন্তু ইসরায়েলের নেগেভের বেন গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। তারা বলছেন, ওজন ফিরে এলেও শরীর ভেতরে ভেতরে উন্নতির পথে একধাপ এগিয়ে থাকে। সেটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ওজনের ওঠানামার এই ‘লাট্টু-চক্র’কে এতদিন নেতিবাচক হিসেবে দেখা হতো। এই“লাট্টু-চক্র’ ডায়েটিং-এর মানে হল, একজন ব্যক্তি ডায়েট ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে ওজন কমালেন, কিন্তু কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলেন। এই প্রক্রিয়া বারবার ঘটে চলে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ওঠানামা শুধু শরীরের ওজনেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শরীরের ভেতরের চর্বি, বিশেষ করে ভিসেরাল বা পেটের অনড় চর্বির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এই ভিসেরাল ফ্যাট হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন হৃৎপিণ্ড- বিপাকীয় রোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

গবেষণার প্রধান গবেষক আইরিশ শাই জানান, শুধুমাত্র ওজনের মাপকাঠিতে ডায়েটের সাফল্য বিচার করা ঠিক নয়। তিনি বলেন, নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখার প্রচেষ্টা শরীরে এক ধরনের “কার্ডিওমেটাবলিক মেমোরি’’ তৈরি করে। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি যদি ডায়েট করে ওজন কমান এবং পরে আবার তার ওজন বাড়ে, তবুও শরীরের ভেতরে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন স্থায়ীভাবে থেকেই যায়। বিশেষ করে ক্ষতিকর পেটের চর্বি কমার ক্ষেত্রে।

এই গবেষণাটি প্রায় ৫০০ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে ৫ ও ১০ বছর ধরে পরিচালিত হয়। তারা দুটি বড় ডায়েট কর্মসূচিতে অংশ নেন। মূলত ভূমধ্য সাগরীয় ডায়েট ও নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমে তাদের শরীরের চর্বি ও বিপাকীয় পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, দ্বিতীয়বার ডায়েট শুরু করার সময় অংশগ্রহণকারীদের ওজন প্রায় আগের মতো থাকলেও, তাদের শরীর আগের তুলনায় অনেক বেশি সুস্থ ছিল। দেখা গেল, ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা বেড়েছে, রক্তে চর্বির মাত্রা কমেছে। সব মিলিয়ে ১৫–২৫% পর্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে।

আরও চমকের বিষয় হলো, দ্বিতীয়বার তারা তুলনামূলকভাবে কম ওজন ঝরালেও, দীর্ঘমেয়াদে তারাই বেশি উপকৃত হয়েছেন। পাঁচ বছর পর দেখা যায়, যারা একবারই ডায়েট করেছিলেন তাদের তুলনায় এদের ওজন কম বেড়েছে এবং পেটে চর্বিও কম জমেছে।

ডায়েটের নির্ধারিত নিয়ম ভেঙে গেলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ প্রতিটি ছোটখাটো চেষ্টা, প্রতিটি স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত, শরীরে নীরবে ইতিবাচক ছাপ রেখে যায়। হয়তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায় না, কিন্তু প্রতিবারের প্রচেষ্টা শরীরে ইতিবাচক প্রভাব রেখে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।

 

সূত্র: “How effective is rejoining a long-term weight loss program? The 5- and 10-year MRI-assessed Follow Interventions Trial (FIT) project” by Hadar Klein, Dafna Pachter, et.al; 30th January 2026, published in BMC Medicine.

DOI: 10.1186/s12916-026-04663-9

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − one =