“মনস্টার মাইন” । শব্দটা শুনলেই মাথায় ভেসে ওঠে সোনার পাহাড়, গোল্ড রাশের উন্মাদনা, ঝলমলে ধাতুর স্বপ্ন। কিন্তু এই গল্পে সোনা নেই। এখানে আছে এমন এক ধাতু যার কোনও ঝলক নেই, গ্ল্যামার নেই। কিন্তু আধুনিক পৃথিবী এক সেকেন্ডও একে ছাড়া অচল । এই ধাতু আলো প্রতিফলিত করে না, কিন্তু সভ্যতার সব আলো এর ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়টাকে আমরা বলি “ডিজিটাল যুগ” । স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়ালেই উত্তর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশ্নের আগেই সমাধান বার করে দেয় নিমেষে। সবকিছু যেন ভাসমান এবং প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু এই ভার্চুয়াল আরামদায়ক পৃথিবীর নীচে লুকিয়ে আছে লোহা, কংক্রিট, তার আর বিদ্যুতের এক বিশাল পরিকাঠামো। প্রতিটি সার্চ, প্রতিটি মেসেজ, প্রতিটি এ আই গণনার পেছনে রয়েছে বিশাল ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ গ্রিড, ট্রান্সফরমার আর কিলোমিটারের পর কিলোমিটার দীর্ঘ ধাতব তার। বিদ্যুৎ যদি না চলে, ডিজিটাল জগৎ মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে যাবে। আর বিদ্যুৎ চলতে গেলে, সব থেকে বেশি যে ধাতুর প্রয়োজন, তা হল তামা।
তবে অনেকের কাছে এর বিকল্প হতে পারে নবায়নযোগ্য শক্তি। এই ধারণা থেকেই জন্ম, ল্যান্ড আর্ট জেনারেটর ইনিশিয়েটিভ বা LAGI-র। তারা এমন বিদ্যুৎকেন্দ্র কল্পনা করে, যেগুলো একসঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং জনপরিসরের শিল্প হয়ে উঠবে। আবু ধাবির মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা ‘উইন্ডস্টক’ যেন ভবিষ্যতের কোনও দৃশ্য। বাতাসে দুলছে ১,২০০-রও বেশি চিকন কার্বন ফাইবার দণ্ড, প্রতিটি প্রায় ৫৫ মিটার উঁচু । কোনও ঘূর্ণায়মান ব্লেড নেই, কোনও বিকট শব্দ নেই। প্রতিটি দণ্ডের ভেতরে থাকা পাইজোইলেকট্রিক সিরামিক, বাতাসের চাপে বিদ্যুৎ তৈরি করে। হাওয়া এখানে শত্রু নয় বরং সহযোগী। রাতে এই দৃশ্যই আরও নাটকীয়। দণ্ডগুলির গায়ে আলো জ্বলে ওঠে, বাতাস বইলেই আলোর ঢেউ ছুটে যায় এক দণ্ড থেকে আরেক দণ্ডে। অদৃশ্য বাতাস হয়ে ওঠে দৃশ্যমান । বিদ্যুৎ উৎপাদন এখানে কেবল ইঞ্জিনিয়ারিং নয়, একটি সার্বিক অভিজ্ঞতা।
এই ভাবনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়। টেক্সাসের অস্টিনে ‘সানফ্লাওয়ার্স’, হিউস্টনে ‘আর্চ অফ টাইম’, সিয়াটলে ‘সনিক বুম’ সবই দেখায় শক্তির পরিকাঠামো কেমন করে শহরের গর্ব হয়ে উঠতে পারে। দূষণহীন প্রাকৃতিক শক্তি এখানে দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু শক্তির আরেকটি মুখ আছে । যা কম সুন্দর ও কঠিন বাস্তব । বছরের পর বছর ধরে বায়ুশক্তিকে দেখানো হয়েছে, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রায় নিখুঁত সমাধান হিসেবে। বাস্তবে উইন্ড টারবাইন একেবারেই সহজ যন্ত্র নয় । প্রবল বাতাস, লবণাক্ত সমুদ্রের হাওয়া, চরম তাপমাত্রা আর অবিরাম যান্ত্রিক চাপ সব মিলিয়ে এগুলো রীতিমতো ধকলের মধ্যে কাজ করে । ফাটল, ক্ষয়, কাঠামোগত দুর্বলতা, এই সমস্যাগুলো চোখে পড়ে না যতক্ষণ না বড় বিপর্যয় ঘটে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বায়ুশক্তি নিয়ে যে প্রাথমিক সংশয় ছিল, তার বড় অংশই ছিল এই বাস্তব জটিলতা নিয়ে। এখন এই শিল্প নিজেই তা স্বীকার করছে । উইন্ড টারবাইন মানেই “ একবার বসিয়ে দিয়ে ভুলে যাওয়ার” প্রযুক্তি নয়। এখানেই প্রবেশ করছে ড্রোন আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা । স্বয়ংক্রিয় ড্রোন এখন চলমান টারবাইনের ব্লেড পরীক্ষা করতে পারে, মানুষের চোখে অদৃশ্য মাইক্রো-ক্র্যাক ধরতে পারে । আগে যেখানে দিন লাগত, এখন সেখানে ঘণ্টা-ই যথেষ্ট। সমুদ্রের মাঝখানে একটি টারবাইনের ব্যর্থতা মানে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি। ড্রোন সেই ঝুঁকি কমাচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারিতে।
এই শক্তির গল্প গিয়ে মিশে যায় আরেক নীরব বিপ্লবে, ব্যাটারি। টেসলা চুপিসারে টেক্সাসে যা করেছে, তা গাড়ির চেয়েও বড় খবর। ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হওয়া এক প্রকল্প ২০২৬-এর শুরুতেই বেশ দাঁড়িয়ে গেছে । উত্তর আমেরিকার প্রথম শিল্প-মাত্রিক ব্যাপক লিথিয়াম হাইড্রক্সাইড রিফাইনারি। এই শোধনাগার বছরে প্রায় পাঁচ লক্ষ বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির জন্য লিথিয়াম জোগাতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এখানে অ্যাসিড ব্যবহার না করেই যে শোধন করা হয়। কম দূষণ, কম খরচ, কম নির্ভরতা । এ কেবল এক কারখানা নয়, এ হল শক্তির ভূ-রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়। কিন্তু ব্যাটারি, টারবাইন, ডেটা সেন্টার সবকিছুর মধ্যেই একটি সাধারণ সূত্র আছে : বিদ্যুৎ যেখানে , তামা সেখানেই।
দীর্ঘদিন ধরে তামার বাজার ছিল স্থিতিশীল। খনি চলত, শিল্প পরিকল্পনা করত । তারপর হঠাৎ সবকিছু একসঙ্গে ঘটতে শুরু করল। ইভি, গ্রিন গ্রিড, এআই, সুপারকম্পিউটার। চাহিদা আকাশছোঁয়া । অথচ নতুন খনির অনুমোদন পেতে বছর ঘুরে যায়, আকরের মান পড়ছে, বিনিয়োগ পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামার ঘাটতি আর কল্পনা নয়, আসন্ন বাস্তবতা । বিদ্যুৎ পরিবহণ, নবায়নযোগ্য শক্তি, অবকাঠামো সবই একই ধাতুর জন্য লড়াই করছে। বিকল্প খোঁজা সহজ শোনালেও, বাস্তবে তা প্রায় অসম্ভব । এখানেই দৃশ্যপটে আসে সেই “মনস্টার মাইন”। উটা- র সল্ট লেক সিটির কাছে কেনেকট মাইন। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ওপেন-পিট তামার খনি। শত বছরের বেশি সময় ধরে চলছে তামা উৎপাদন । ১৯ মিলিয়ন টনেরও বেশি তামা উৎপাদিত হচ্ছে। এটা এত বিশাল যে মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। এক সময় এটিই ছিল শিল্প ইতিহাসের প্রতীক। আজ এটি ভবিষ্যতের অতি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ । কারণ তামা ছাড়া ডিজিটাল ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
তাই আমরা যে ভবিষ্যৎ কল্পনা করি, মানে স্মার্ট, দূষণহীন, স্বয়ংক্রিয় ভবিষ্যৎ , তার শিকড় এখনও মাটির গভীরে। কেনেকট দেখিয়ে দেয়, দীর্ঘস্থায়ী তামার উৎস কতটা বিরল হয়ে উঠেছে। যদি জোগান পিছিয়ে পড়ে, তামাই হয়ে উঠতে পারে বৈশ্বিক অগ্রগতির সবচেয়ে বড় বাধা। এ আই-এর যুগে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কোনও অ্যালগরিদম নয়, কোনও অ্যাপ নয়। এটি সেই অনুজ্জ্বল ধাতু, যা আলো ছড়ায় না, কিন্তু সব আলোই যার উপরে দাঁড়িয়ে আছে।
সূত্র: The Pulse, January 2026
