কেলাস এমন এক গঠন, যা নিজেকে পুনরাবৃত্ত করে। কিন্তু কোয়াসিক্রিস্টাল বা প্রায়-কেলাসের গল্প আলাদা। বাইরে থেকে এগুলো সুশৃঙ্খল মনে হলেও এদের গঠন নিয়মিতভাবে পুনরাবৃত্ত হয় না। অর্থাৎ দুই খন্ডে পুরোপুরি মিলে যাওয়া প্যাটার্ন এখানে পাওয়া যাবে না। এখানে অন্য এক ধরনের গভীর গাণিতিক শৃঙ্খলা কাজ করে । কেলাস ও প্রায়-কেলাস দুটোই মূলত গাণিতিক ধারণা, যা বাস্তব জগতে পদার্থের গঠনে দেখা যায় – সাধারণত দুই বা তিন মাত্রায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধারণা কি দেশ-কাল বা স্পেসটাইমে প্রযোজ্য? ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ফেলিক্স ফ্লিকার প্রথমে সন্দিহান ছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, “ঠিকঠাক স্পেসটাইম কোয়াসিক্রিস্টাল বানানো সম্ভব হবে না।“ কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা দেখে তিনি বিস্মিত। তাঁর কথায়, গবেষকেরা যা তৈরি করেছেন, তা “স্পেসটাইমকে একত্রে ধরলে সবচেয়ে মার্জিত গঠনগুলোর একটি।“ প্রায়-কেলাসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, পুনরাবৃত্তি না থাকলেও স্থানভেদে তাদের সামগ্রিক চরিত্র প্রায় একই থাকে। ধরা যাক একটি পিঁপড়ে এক জায়গায় বসে আছে। সে কোয়াসিক্রিস্টালের যে গঠন দেখবে, অন্য জায়গায় থাকা আরেকটি পিঁপড়েও প্রায় একই রকম গঠনই দেখতে পাবে। কিন্তু স্পেসটাইমের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। দেশ-কাল মানে শুধু জায়গা নয়, সময়ও তার অংশ। আর স্পেসটাইম একটি মৌলিক নিয়ম মেনে চলে- লরেঞ্জ সুসাম্য। লরেঞ্জ সুসাম্য বলছে, কেউ স্থির থাকুক বা আলোর কাছাকাছি গতিতে চলুক, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম বদলাবে না। দ্রুতগতির পর্যবেক্ষকের জন্যও প্রকৃতির নীতি একই থাকবে। কিন্তু সাধারণ কেলাস কিংবা প্রায়-কেলাস এই সুসাম্য মানে না। কারণ আপেক্ষিকতার নিয়ম অনুযায়ী, দ্রুতগতির পর্যবেক্ষণে বস্তুগুলিকে সংকুচিত দেখায়। ফলে গঠন বিকৃত হয়। স্থির পিঁপড়ে আর আলোর গতির কাছাকাছি ছুটে চলা পিঁপড়ে একই গঠন দেখবে না। কিন্তু নতুন স্পেসটাইম কোয়াসিক্রিস্টাল এখানেই আলাদা। এগুলো লরেঞ্জ সুসাম্য মেনে চলে। স্থির পিঁপড়ে আর রকেটে চড়া দ্রুতগতির পিঁপড়ে দুজনেই এর একই গঠন দেখবে।
গবেষকেরা কীভাবে এটি বানালেন? তাঁরা উচ্চ মাত্রার একটি বিন্দু-জালের মধ্য দিয়ে চার-মাত্রিক একটি “ফালি” কেটে নিলেন। তারপর সেই বিন্দুগুলোকে ঐ ফালির উপর প্রক্ষেপ করলেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ফালির ঢাল একটি অমূলদ সংখ্যা, যেমন- পাই (π)। অমূলদ মানে এমন সংখ্যা, যাকে দুইটি পূর্ণসংখ্যার ভগ্নাংশ হিসেবে লেখা যায় না। এই অমূলদ ঢালের কারণে ফালিটি কখনও সরাসরি জালের বিন্দুগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ফলে তৈরি হয় এমন এক গঠন, যা কখনও নিজেকে ঠিকভাবে পুনরাবৃত্ত করে না ঠিকই, তবু শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে । কানাডার পেরিমিটার ইন্সটিটিউশন-এর গবেষক সোতিরিস মিগদালাস বলছেন, “আমরা যে স্পেসটাইমে বাস করি, সেটাই হয়তো একটি কোয়াসিক্রিস্টাল।“ এই ধারণা বিশেষ করে কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির কিছু তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত। কিছু তত্ত্ব বলছে, অতি ক্ষুদ্র স্কেলে স্পেসটাইম ভাঙা-ভাঙা বিন্দুতে গঠিত। সেখানে স্পেসটাইম কোয়াসিক্রিস্টাল এমন একটি কাঠামো দিতে পারে, যা লরেঞ্জ সুসাম্য বজায় রেখেই এই ভাঙন ব্যাখ্যা করবে। গবেষকেরা স্ট্রিং তত্ত্ব নিয়েও ভাবছেন। স্ট্রিং তত্ত্ব অনুযায়ী, মৌলিক কণাগুলো ক্ষুদ্র কম্পমান স্ট্রিং বা তার, আর মহাবিশ্বে থাকতে পারে ১০টি মাত্রা। আমরা যদিও দেখি তিনটি স্থানীয় মাত্রা ও একটি সময়মাত্রায়। সাধারণ ব্যাখ্যায় বলা হয়, অতিরিক্ত মাত্রাগুলো খুব ছোট হয়ে কুঁচকে আছে। কিন্তু স্পেসটাইম কোয়াসিক্রিস্টাল আরেকটি সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। হয়তো ১০টি মাত্রাই কুঁচকে থাকতে পারে, আর সেই কোঁচকানো গঠন থেকেই অমূলদ ঢালের একটি “ফালি” কেটে তৈরি হতে পারে আমাদের দেখা অসীম স্থান-কাল। তবে গবেষকেরা নিজেরাই স্বীকার করছেন, এই ধারণা এখনো পুরোপুরি সিদ্ধ নয়। এর আকর্ষণীয়তা অনস্বীকার্য। যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ গ্রেগরি ম্যুর বলছেন, “গণিতের দিক থেকে এটি অসাধারণ সুন্দর। তবে পদার্থবিজ্ঞানের দিক থেকে এটি এখনও বেশ অনুমাননির্ভর।” অর্থাৎ, প্রমাণের পথ দীর্ঘ। কিন্তু যদি সত্যিই স্পেসটাইম একটি কোয়াসিক্রিস্টাল হয়, তবে আমরা যে বাস্তবতাকে চিনি, তার গভীরে লুকিয়ে থাকতে পারে পুনরাবৃত্তিহীন, অথচ শৃঙ্খলাবদ্ধ এক মহাজাগতিক নকশা।
সূত্রঃ Science News ; Feb, 2026
