পৃথিবীর প্রায় দু’কিলোমিটার নীচে, বিজ্ঞানীরা এক অদ্ভুত মুহূর্ত ধরে ফেলেছেন। সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, মানুষের দৈনন্দিন কার্যকলাপও নেই। এই গভীর ভূগর্ভস্থ পরীক্ষাগারেই ধরা পড়েছে ‘নিউট্রিনো’ – যে নীরবে এসে একটি পরমাণুকে বদলে দেয়। এই ঘটনাটি শুনতে ক্ষুদ্র মনে হলেও, এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বিশাল। কারণ নিউট্রিনো এমন এক কণা, যাকে ধরা প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। নিউট্রিনোকে বিজ্ঞানীরা প্রায়ই “ghost particle বা ভূতুড়ে কণা’’ বলেন । কারণ তারা পদার্থের সঙ্গে খুবই কম মিথস্ক্রিয়া করে। প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি নিউট্রিনো আমাদের শরীর ভেদ করে চলে যায়, অথচ আমরা টেরই পাই না। সূর্য, সুপারনোভা বিস্ফোরণ, এমনকি মহাবিশ্বের প্রাচীন ঘটনাগুলো থেকেও নিউট্রিনো তৈরি হয়েছে। এরা আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে ছুটে বেড়ায় মহাকাশ জুড়ে। কিন্তু এত দ্রুত আর এত নিঃশব্দে চলাফেরা করে যে তাদের ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। তাই কোনো নিউট্রিনোকে “হাতে-নাতে’’ একটি পরমাণুর গঠন বদলাতে দেখা, পদার্থবিজ্ঞানের এক বিরল ঘটনা। এই ক্ষণিক মুহূর্তটি ধরা পড়েছে এক বিশাল ভূগর্ভস্থ ডিটেক্টরে । পৃথিবীর গভীরে এমন ল্যাব বানানোর কারণ খুব সহজ। উপরে মহাজাগতিক রশ্মি আর নানা ধরনের বিকিরণ রয়েছে, যা সূক্ষ্ম সংকেতকে ঢেকে দেয়। তাই গবেষকরা কয়েক কিলোমিটার পাথরের আড়ালে বসিয়েছেন অত্যন্ত পরিষ্কার উপাদান দিয়ে তৈরি বিশাল ট্যাংক। এগুলো ভর্তি থাকে বিশেষ তরল বা গ্যাসে। যখন কোনো নিউট্রিনো সেখানে এসে কোনো পরমাণুকে আঘাত করে, তখন ঘটে ক্ষুদ্র এক প্রতিক্রিয়া। সেটি এতই সূক্ষ্ম যে প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু সেই আঘাতের ফলে তৈরি হয় একটি ক্ষুদ্র আলোর ঝলক। মুহূর্তের জন্য জ্বলে ওঠা এক ফিসফিসে সংকেত। এই ক্ষীণ আলোই বিজ্ঞানীদের জানিয়ে দেয়, হ্যাঁ, নিউট্রিনো এখানে এসেছে এবং একটি পরমাণুকে বদলে দিয়েছে। এই ছোট্ট আলোর ঝলক আসলে বড় এক বৈজ্ঞানিক কাহিনীর দরজা খুলে দেয়। নিউট্রিনোর সঙ্গে পরমাণুর এই মিথস্ক্রিয়া বুঝতে পারা গেলে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন মহাকাশে শক্তি কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সূর্যের কেন্দ্রে যে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটে, সেখান থেকে অসংখ্য নিউট্রিনো তৈরি হয় এবং তারা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তাই কণাগুলো নক্ষত্রের ভেতরের ঘটনার এক ধরনের বার্তাবাহক। নিউট্রিনোকে বোঝা মানে নক্ষত্রের অন্দরের পদার্থবিদ্যাকে বোঝা। তাছাড়া এই আবিষ্কারের আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, নিউট্রিনোর আচরণ বুঝতে পারলে , ডার্ক ম্যাটার নিয়ে নতুন ধারণা পাওয়া যেতে পারে, যা কিনা মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় ধাঁধাগুলোর একটি। ডার্ক ম্যাটার এমন এক অদৃশ্য পদার্থ, যা দিয়ে মহাবিশ্বের অধিকাংশ ভর তৈরি , কিন্তু সরাসরি তাকে দেখা যায় না। নিউট্রিনো নিজেও রহস্যময় আচরণ করে। তারা কখনও কখনও এক ধরনের কণা থেকে অন্য ধরনের কণায় রূপ বদলায়, যাকে বিজ্ঞানীরা অসিলেশন বলেন। এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হয়তো মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়ম বোঝার নতুন পথ দেখাতে পারে। আরও গভীর এক প্রশ্নও এখানে জড়িয়ে আছে, মহাবিশ্বে এমন পদার্থ আছে কেন? বিগ ব্যাংয়ের সময় তত্ত্ব অনুযায়ী পদার্থ আর প্রতিপদার্থ প্রায় সমান পরিমাণে তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় পদার্থই টিকে গেছে, আর প্রতিপদার্থ প্রায় হারিয়ে গেছে। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, নিউট্রিনোর অদ্ভুত আচরণেই হয়তো এই বৈষম্যের সূত্র লুকিয়ে আছে। ঘটনাটি স্থায়ী ছিল মাত্র এক মুহূর্ত। তবু তার প্রতিধ্বনি পৌঁছাতে পারে মহাবিশ্বের গভীরতম প্রশ্ন পর্যন্ত।
সূত্র: Trendora, 5 March 2026.
