নাইট্রেট দূষণের বহুমাত্রিক অভিঘাত

নাইট্রেট দূষণের বহুমাত্রিক অভিঘাত

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ জানুয়ারী, ২০২৬

আধুনিক কৃষি উৎপাদন বিশ্বকে খাদ্য নিরাপত্তা দিলেও, তার এক অপ্রত্যাশিত মূল্য আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে মিঠে জলের দূষণে। নাইট্রেট দূষণ এখন বহু কৃষিপ্রধান অঞ্চলের সবচেয়ে জটিল পরিবেশগত সমস্যাগুলির একটি। সার, পশুর মলমূত্র ও মানববর্জ্য থেকে উৎপন্ন নাইট্রোজেন মাটিতে অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নাইট্রেটে রূপান্তরিত হয় এবং বৃষ্টি বা সেচের জলের সঙ্গে ধুয়ে নদী, খাল ও ভূগর্ভস্থ জলে প্রবেশ করে। একবার জলে পৌঁছালে এই দূষণ বহু কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে পানীয় জল ও মৎস্যসম্পদের জন্য ব্যবহৃত হ্রদে গিয়ে জমা হয়।

চীনের ইয়াংত্সে নদী বদ্বীপ অঞ্চলে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই দূষণের জটিল গতিপথকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছে। এই অঞ্চলে শস্যচাষ, পশুপালন, মাছচাষ, গ্রামীণ বসতি ও দ্রুত বেড়ে ওঠা শহর একই জলব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে জল ভূমির উপর দিয়ে ও নীচ দিয়ে একাধিক স্তরে প্রবাহিত হয়ে তাইহু হ্রদের মতো বৃহৎ মিঠে জলের আধারে গিয়ে পৌঁছায়। গবেষণাটি থেকে দেখা যায়, এই সংযুক্ত জলপ্রবাহই নাইট্রেট দূষণ নিয়ন্ত্রণকে এত কঠিন করে তুলেছে।

নাইট্রেটের উৎস নির্ণয়ে গবেষকরা প্রচলিত জলপরীক্ষার বাইরে গিয়ে এক সমন্বিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করেন। জলের রাসায়নিক বিশ্লেষণের সঙ্গে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের স্থিতিশীল আইসোটোপ ব্যবহার করে দূষণের স্বাক্ষর চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেলের মাধ্যমে বিভিন্ন উৎস কী পরিমাণ দায়ী তা নির্ধারণ করা হয়। ফলাফল হিসেবে দেখা গেছে—ঐতিহ্যবাহী কৃষি এলাকায় পশুপালন ও গ্রামীণ গৃহস্থালির বর্জ্য থেকেই আসে সর্বাধিক নাইট্রেট, যার ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের চেয়েও বড়। অন্যদিকে, মৎস্যচাষ-প্রধান অঞ্চলে মাছের পুকুরের বর্জ্য ও নিষ্কাশিত জল একটি গুরুতর অথচ প্রায় উপেক্ষিত দূষণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গবেষণাটি থেকে আরও জানা যায়, নাইট্রেট চলার পথে রূপান্তরিত হয়। উপরের অক্সিজেনসমৃদ্ধ জলে অণুজীবের কার্যকলাপে নাইট্রেটে পরিণত হওয়ার মাত্রা বাড়ে, আর ভূগর্ভস্থ অক্সিজেন স্বল্প পরিবেশে ডিনাইট্রিফিকেশন ঘটিয়ে নাইট্রেটের পরিমাণ কমালেও তৈরি করে শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস নাইট্রাস অক্সাইড। ফলে জলদূষণের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্রও স্পষ্ট হয়।

 

ভূমি ও জলকে আলাদা করে দেখলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কার্যকর সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত জলাধার ব্যবস্থাপনা, উন্নত পশুবর্জ্য ও মাছচাষের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, এবং বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত সার ব্যবহার। দ্রুত নগরায়ন ও খাদ্য উৎপাদনের চাপে থাকা অঞ্চলে পরিবেশ রক্ষার জন্য এই সমন্বয়ই ভবিষ্যতের একমাত্র পথ।

 

 

সূত্র:Tracing the nitrate source and process in rural-urban ecotone: integrated multi-tracer approach by Sidi chen, Zihan Zahou, er.al; published in Nitrogen cycling, 30 December 2025.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 − 3 =