‘নিউক্লিয়ার ক্লক’

‘নিউক্লিয়ার ক্লক’

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩১ মার্চ, ২০২৬

পরমাণু ঘড়ির পর এবার বিজ্ঞানীরা আরও এক ধাপ এগোচ্ছেন, একটি সম্ভাব্য বৈপ্লবিক যন্ত্রের দিকে, যার নাম ‘নিউক্লিয়ার ক্লক’। এই ঘড়ি সময় মাপবে পরমাণুর ইলেকট্রন নয়, কেন্দ্রক বা নিউক্লিয়াসের শক্তির পরিবর্তন হিসেব করে। গবেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত ঘড়ি হয়ে উঠতে পারে। বহু দশক আগে থেকেই বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছিলেন, থোরিয়াম-২২৯ (²²⁹Th) নামের একটি বিশেষ আইসোটোপ এই ধরনের ঘড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু এই আইসোটোপের নিউক্লিয়াসে ঠিক কোন শক্তিস্তরে পরিবর্তন ঘটে, তা নির্ভুলভাবে জানা যাচ্ছিল না। অবশেষে ২০২৪ সালে লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে সেই জট খুলেছে। এই সাফল্যের পর থেকেই নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরির দৌড় শুরু হয়েছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের পদার্থবিদ এরিক হাডসনের মতে, “এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হতে আর খুব বেশি দেরী নেই। ২০২৬ সালের মধ্যেই হয়ত নিউক্লিয়ার ক্লকের প্রথম পরীক্ষামূলক মাপজোক দেখা যাবে।” চীন, ইউরোপ, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক ডজন গবেষণা দল ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তির বিভিন্ন অংশ নিয়ে কাজ করছে। একটি কার্যকর নিউক্লিয়ার ক্লক বানাতে দরকার দুটি প্রধান উপাদান। একটি হল, নির্ভরযোগ্য থোরিয়াম-২২৯ উৎস, অন্যটি হল, অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অতিবেগুনি লেজার। এই লেজারই নিউক্লিয়াসে শক্তির পরিবর্তন ঘটাবে, যা ঘড়ির ‘টিক’ হিসেবে গণনা করা হবে। সময় মাপার মূল ধারণা আসলে খুব সহজ : নিয়মিত ও দ্রুত পুনরাবৃত্ত কোনো ঘটনার সংখ্যা গোনা। বর্তমানে সবচেয়ে উন্নত অপটিক্যাল অ্যাটমিক ক্লকে এই কাজটি হয় ইলেকট্রনের শক্তিস্তর পরিবর্তনের মাধ্যমে। এই ঘড়িগুলি এতটাই নিখুঁত যে প্রায় ৪০ বিলিয়ন বছরে মাত্র ১ সেকেন্ড ভুল হয়। কিন্তু নিউক্লিয়ার ক্লক আরও এগিয়ে যেতে পারে। কারণ ইলেকট্রনের তুলনায় নিউক্লিয়াস বাইরের পরিবেশের প্রভাব (যেমন তাপমাত্রা বা চৌম্বক ক্ষেত্র) থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকে। ফলে এটি কম ‘ব্যাঘাত’-এ কাজ করতে পারে, আরও নির্ভুল সময় দিতে পারে। তবে এই পথে বড় প্রযুক্তিগত সমস্যাও রয়েছে। নিউক্লিয়ার ক্লকের জন্য প্রয়োজন প্রায় ১৪৮ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের একটি অতিবেগুনি লেজার, যা এখনও সম্পূর্ণ রূপে তৈরি করা যায়নি। চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল সম্প্রতি ১৪৮.৪ ন্যানোমিটারে ১০০ ন্যানোওয়াট শক্তি উৎপন্ন করতে পেরেছে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম বাষ্পকে প্রায় ৫৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গরম করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে, আরেকটি পদ্ধতিতে অপটিক্যাল লেজারের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশেষ কেলাসের মাধ্যমে কমিয়ে আনা হচ্ছে। কোনো কোনো পরীক্ষায় প্রায় ৪০ মাইক্রোওয়াট স্থিতিশীল শক্তি পাওয়া গেছে, যা আশার খবর। লেজারের পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যা হল, থোরিয়াম-২২৯-এর একটি স্থিতিশীল উৎস তৈরি করা। এর জন্য বিজ্ঞানীরা দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। প্রথমটি একটি কঠিন কেলাসের মধ্যে বিপুল সংখ্যক থোরিয়াম আয়ন ব্যবহার করা। এতে সংকেত শক্তিশালী হয়, কিন্তু স্থিতিশীলতা কমে যায়। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে খুব অল্প সংখ্যক আয়নকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ‘আয়ন খাঁচা’য় আটকে রাখা হয়। এতে নির্ভুলতা বেশি, কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে এটি আরও কঠিন। বর্তমান কেলাস পদ্ধতিতে একটি বড় সমস্যা হল ‘লাইনের প্রশস্ততা’। অর্থাৎ সংকেতের ফ্রিকোয়েন্সির বিস্তার বেশি হয়ে যাচ্ছে, যা নির্ভুলতা কমায়। গবেষকরা মনে করছেন, কেলাসের ভেতরের অমিশ্রণ এর জন্য দায়ী। তাই তারা নতুন ধরনের কেলাস এবং পাতলা ফিল্ম নিয়ে পরীক্ষা করছেন। সব মিলিয়ে, নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরির পথ এখনও পুরোপুরি মসৃণ নয়। কিন্তু গবেষকরা আত্মবিশ্বাসী যে, এই প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান সময়ের ব্যাপার মাত্র। যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে সময় মাপার জগতে শুরু হবে এক নতুন যুগ, যেখানে নির্ভুলতা পৌঁছে যাবে অভূতপূর্ব উচ্চতায়।

 

সূত্র: Nature , March 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 5 =