নিউরোমর্ফিক কম্পিউটারের অসাধারণ পটুত্ব 

নিউরোমর্ফিক কম্পিউটারের অসাধারণ পটুত্ব 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ জানুয়ারী, ২০২৬

মানবমস্তিষ্কের নকলে বানানো কম্পিউটার একটা সময়ে কল্পকাহিনির মতো শোনাতো। কিন্তু আজ তা বাস্তব। নিউরোমর্ফিক কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার ও কাজের ধরন মস্তিষ্কের নিউরনেরই মতো। তারা শুধু ছবি চেনা বা মুখ শনাক্ত করতেই দক্ষ নয়, চাইলে বাস্তব জগতের সবচেয়ে কঠিন গাণিতিক সমস্যাও সমাধান করতে পারে। স্যান্ডিয়া ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিজের কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্টিস্ট ব্র্যাড তেথাইলম্যান ও ব্র্যাড আইমোন এক অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন। তাতে নিউরোমর্ফিক হার্ডওয়্যার, আংশিক অবকলন সমীকরণ সমাধান করতে পারে, যা বিজ্ঞানের ভাষায় বাস্তবতার মেরুদণ্ড। তরল প্রবাহ, তড়িৎচৌম্বক আচরণ,আবহাওয়া পূর্বাভাস, কিংবা কোনো কাঠামো কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে, সব কিছুর মধ্যে লুকিয়ে আছে এই সমীকরণগুলি। এতদিন পর্যন্ত এই ধরনের সমীকরণের সমাধান মানেই ছিল বিশাল সুপারকম্পিউটার, বিপুল বিদ্যুৎ খরচ আর ঘণ্টার পর ঘণ্টার হিসাব। কিন্তু স্যান্ডিয়ার এই নিউরোমর্ফিক সিস্টেম একই কাজ করতে পারে অনেক কম শক্তি খরচ করে। গবেষকদের মতে, এই সাফল্য ভবিষ্যতে বিশ্বের প্রথম নিউরোমর্ফিক সুপারকম্পিউটারের সুযোগ তৈরি করবে, যার প্রভাব পড়বে জাতীয় নিরাপত্তা থেকে শুরু করে শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির সর্বত্র। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, নিউরোমর্ফিক সিস্টেম মূলত প্যাটার্ন রিকগনিশন কিংবা কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক ত্বরান্বিত করার কাজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কঠিন গাণিতিক সমস্যা, বিশেষ করে আংশিক অবকলন সমীকরণ ছিল মূলত সাবেকি সুপারকম্পিউটারের দখলে। কিন্তু আইমোন ও থাইলম্যান সেই ধারণাকেই উল্টে দিলেন। আইমোন মনে করিয়ে দেন, আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত এমন সব জটিল হিসাব করে, যা আমরা টেরও পাই না। “একটা টেনিস বল মারা বা ক্রিকেটে ব্যাট চালানো। এগুলি আসলে এক্সাস্কেল-লেভেলের গণনা। অথচ আমাদের মস্তিষ্ক এই কাজগুলি করে অবিশ্বাস্যভাবে কম শক্তি খরচে।“ যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের জন্য গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। পারমাণবিক অস্ত্রব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ভৌত সিমুলেশন চালাতে আজ যেসব সুপারকম্পিউটার ব্যবহৃত হয়, সেগুলি প্রচুর পরিমাণ বিদ্যুৎ গিলে খায়। নিউরোমর্ফিক কম্পিউটিং-এ একই ধরনের বাস্তব পদার্থবিদ্যার সমস্যা মস্তিষ্ক-অনুপ্রাণিত দক্ষতায়, অনেক কম শক্তিতে সমাধান করা সম্ভব। এই অ্যালগরিদমের সাথে মস্তিষ্কের কর্টিকাল নেটওয়ার্কের গঠন ও গতিবিদ্যার মিল রয়েছে। থাইলম্যান জানান, তারা যে সার্কিট ব্যবহার করেছেন, তা কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্সে বহুপরিচিত একটি মডেলের উপর ভিত্তি করেই। মডেলের সঙ্গে আংশিক অবকলন সমীকরণের একটি স্বাভাবিক কিন্তু অদেখা যোগসূত্র আছে। মডেলটি প্রস্তাবের ১২ বছর পর সেই যোগসূত্র প্রথম ধরা পড়ে। এর প্রভাব শুধু কম্পিউটিং বা জাতীয় নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়। মস্তিষ্ক কীভাবে গণনা করে, তা এখনও পুরোপুরি বোঝা যায়নি। যদি নিউরোমর্ফিক কম্পিউটিং সেই রহস্য ভাঙতে সাহায্য করে, তাহলে আলঝেইমার বা পার্কিনসনের মতো রোগ বোঝা ও চিকিৎসার পথও নতুনভাবে খুলে যেতে পারে। নিউরোমর্ফিক কম্পিউটিং-এর এই সাফল্যই হয়তো আগামী দিনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গতিপথ বদলে দেবে।

 

সূত্র: “Solving sparse finite element problems on neuromorphic hardware” by Bradley H. Theilman, and James B. Aimone, 13 November 2025, Nature Machine Intelligence.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + 10 =