নিয়মিত ভালো ঘুমের আবশ্যকতা 

নিয়মিত ভালো ঘুমের আবশ্যকতা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১ মার্চ, ২০২৬

ভোরের নিস্তব্ধতা। পুরো শহর ঘুমিয়ে। তখন অসংখ্য মানুষ জুতোর ফিতা বেঁধে বেরিয়ে পড়েন দৌড়াতে। সমীক্ষা বলছে বিশ্বজুড়ে ৬২০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিয়মিত দৌড়ান। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ভোরের আলো ফোটার আগেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু আগের রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে সেই দৌড়ই হয়ে উঠতে পারে চোটের ঝুঁকির কারণ। এমনই সতর্কবার্তা দিচ্ছে সাম্প্রতিক এক গবেষণা।

এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন নেদারল্যান্ডসের আইন্ডহোভেন ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির এবং ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ অস্ট্রেলিয়ার অধ্যাপক ইয়ান দে ইয়ং। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস পত্রিকাতে।

৪২৫ জন বিনোদন দৌড়বিদের ওপর করা সমীক্ষায় দেখা যায়, যারা কম সময় ঘুমান, যাদের ঘুমের মান খারাপ, অথবা প্রায়ই ঘুম ভেঙে যায় , তাদের চোট পাওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ। অধ্যাপক দে ইয়ং বলেন, “ঘুম যেকোনো বড় ছোটো আঘাতের প্রতিরোধক।” গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ঘুম অস্থির ও নিম্নমানের, তারা ভালো ও নিয়মিত ঘুমানো দৌড়বিদদের তুলনায় ১.৭৮ গুণ বেশি চোটের শিকার হন। ১২ মাসের মধ্যে তাদের আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ, আপনি কত কিলোমিটার দৌড়ালেন বা কী খাদ্যাভ্যাস মেনে চললেন তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি কতটা ভালো বিশ্রাম নিচ্ছেন।

বিনোদন দৌড় বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয়, কিন্তু চোটের হারও এখানেই সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৯০ শতাংশ দৌড়বিদ জীবনের কোনো না কোনো সময় আঘাত পান। এই গবেষণার বিশেষত্ব হলো—এটি শুধু ঘুমের সময়কাল নয়, ঘুমের গুণমান এবং ঘুমজনিত সমস্যার উপস্থিতিকেও একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেছে। দেখা গেছে, যারা ঘুমাতে দেরি করেন, রাতে বারবার জেগে ওঠেন বা সকালে সতেজ অনুভব করেন না, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

ঘুম কেবল বিশ্রাম নয়; এটি শরীরের পুনর্গঠনের এক মৌলিক প্রক্রিয়া। গভীর ঘুমের সময় পেশি–তন্তু মেরামত হয়, হরমোনের ভারসাম্য পুনঃস্থাপিত হয়, স্নায়ুতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হয়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে কোষকলার পুনর্গঠন ব্যাহত হয়, মনোযোগ কমে যায়, প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় ধীর হয়, আর সেটাই দৌড়ানোর সময় ভারসাম্যহীনতা ও চোটের ঝুঁকি বাড়ায়।

গবেষকেরা তাই বলছেন, ঘুমকে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে নয়, বরং প্রশিক্ষণের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা উচিত। বিশেষ করে যারা কাজ, পরিবার ও সামাজিক দায়িত্বের পাশাপাশি অনুশীলন করেন, তাদের বিশ্রামের প্রয়োজন গড়পড়তা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশি । বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম আদর্শ; ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে দিনের ঘুমও উপকারী।

নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা, ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমানো, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল পান কমানো এবং শোবার ঘরকে শান্ত ও ঠান্ডা রাখা – এসব সহজ পদক্ষেপ ঘুমের মান উন্নত করতে পারে।

মোটকথা, দৌড়ের গতি বাড়ানোর আগে ঘুমের মান বাড়ান। কারণ সেরা পারফরম্যান্সের ভিত্তিই হল পর্যাপ্ত ঘুম।

 

সূত্র: “Sleep Matters: Profiling Sleep Patterns to Predict Sports Injuries in Recreational Runners” by Jan de Jonge and Toon W. Taris, 7 October 2025, Applied Sciences.

DOI: 10.3390/app151910814

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 + 1 =