ন্যানোজগতঃ বিন্দুতে সিন্ধু

ন্যানোজগতঃ বিন্দুতে সিন্ধু

Posted on ১০ এপ্রিল, ২০১৯

রামের জন্মের আগেই যেমন মহর্ষি বাল্মিকী রামায়ণ লিখে ফেলেছিলেন, খানিকটা তেমনই ‘ন্যানো সায়েন্স’ বা ‘ন্যানো টেকনোলোজি’ শব্দগুলোর আনুষ্ঠানিক আবির্ভাবের ঢের আগেই মানুষ এই বিষয়ের চর্চা নিজেদের অজান্তেই ক’রে ফেলেছিল, শিখে গিয়েছিল এর ব্যবহার! আশ্চর্য লাগলেও সত্যি। সাম্প্রতিক অতীতে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যখন পায়ে পায়ে হাঁটতে শিখছে সেই যুগসন্ধিক্ষণে (‘ন্যানোসায়েন্স’ নামক বিজ্ঞানের শাখা অজানা থাকলেও ) ন্যানোবস্তু বা ন্যানোমাত্রা-বিষয়ক গবেষণায় জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল(১৮৩১-১৮৭৯) বা রিচার্ড অ্যাডলফ জিগমন্ডি(১৮৬৫-১৯২৯)-র মতো বিজ্ঞানীর নাম উল্লেখযোগ্য। সোনা এবং আরও কিছু পদার্থের কলয়েডীয় গঠন নিয়ে গবেষণার সময় জিগমন্ডি এদের ন্যানো অবতারের সমতুল্য গঠন আবিষ্কার ক’রে ফেলেন। তবে ন্যানো বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি নিয়ে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য এবং আলোড়ন-ফেলে-দেওয়া আলোচনাটির বক্তা হিসেবে রিচার্ড ফেইনম্যানকেই ধরা হয়। জনপ্রিয় এবং সুরসিক এই মার্কিন বিজ্ঞানীপ্রবরের ১৯৫৯ সালের সেই আলোচনার শিরোনাম ছিল ‘নিচের দিকে অনেক জায়গা আছে!’(There’s plenty of room at the bottom)। বিভিন্ন পদার্থকে কোনো-না-কোনো উপায়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আকারে পরিণত করতে হবে। তারপর তাদের আপাতআভবে অদেখা অথচ সেই ক্ষুদ্র অবস্থায় ঘটানো বিস্ময়কর কিছু আচরণের মাধ্যমে কীভাবে চমকপ্রদ সব দিগন্ত আমাদের সামনে খুলে যেতে পারে, মুখ্যত এ-নিয়েই সেদিন বলেছিলেন ফেইনম্যান সাহেব। সাধারণ মাত্রা থেকে পদার্থ ন্যানো মাত্রায় নেমে এলেই দেখা যাবে তাতে কণাবলবিদ্যা বা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রভাব। ফলে তাদের তড়িৎ পরিবাহিতা, চৌম্বক ধর্ম, গঠনগত বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ভিন্নধর্মী আচরণ লক্ষ্য করা যাবে। আর ‘ন্যানোপ্রযুক্তি’ (nanotechnology) শব্দবন্ধটা ১৯৭৪ সালে প্রথম বলেন জাপানী বিজ্ঞানী নরিও তানিগুচি। তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। তবে এইসব ধারণাগুলোকে তত্ত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযুক্ত ক’রে তুলেছেন যারা তাদের মধ্যে কে. এরিক ড্রেক্সলারের উল্লেখ না-করলে অন্যায় হবে। আশির দশকে আণবিক প্রযুক্তিবিদ্যায় ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ে তিনি নিরন্তর গবেষণা করেন, এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই ও গবেষণাপত্র লেখেন। তার মধ্যে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘ ইঞ্জিন্স অফ ক্রিয়েশনঃ দ্য কামিং এরা অফ ন্যানোটেকনোলজি’ বিশেষভাবে উল্লেখ্য।

আচ্ছা এই ‘ন্যানো সায়েন্স’ ব্যাপারটা ঠিক কী? বিজ্ঞানের যে শাখায় ন্যানোমিটার স্কেলে কোনো বস্তুর বা ঘটনার পর্যালোচনা করা হয়, তাকেই এককথায় ন্যানো সায়েন্স বলা যেতে পারে। আর এই ন্যানোমিটার স্কেলটা কী? এক মিটারের একশ’ কোটি ভাগের এক ভাগ (মানে দশমিকের পরে আটখানা শূন্যর পর নবম ঘরে এক বসলে)-কে বলা হয় এক ন্যানোমিটার। কোনো বস্তুর যে কোনো মাত্রা (দৈর্ঘ্য ,প্রস্থ, উচ্চতা) তার সঙ্গে তুলনীয় হলেই তাকে ন্যানোবস্তু (nano material) বলা যেতে পারে। মোটামুটিভাবে তিন চারটে পরমাণু একসঙ্গে যতটা চওড়া হয় সেটা প্রায় এক ন্যানোমিটার। আমাদের ডি.এন.এ অণুর ব্যাস প্রায় দুই ন্যানোমিটার। আমাদের একটা মাথার চুলও এই মাপের তুলনায় প্রায় ২৫০০০ গুণ মোটা! এতেই বোঝা যায় আসলে এই পরিমাপ কতটা ক্ষুদ্র।

প্রকৃতি যেমন সব বিষয়েই মানুষকে প্রথম পাঠ দিয়ে থাকে, এ-ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি মোটেই। টিকটিকি বা গিরগিটি জাতীয় সরীসৃপদের পায়ের পাতায় অসংখ্য সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ন্যানোরোম থাকে, যা তাদের কোনো নততল বা খাড়া মসৃণতলেও উপর থেকে নিচে অনায়াসে নামতে সাহায্য করে। রেশমের তন্তু প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ন্যানো প্রযুক্তির একটা অন্যতম উদাহরণ। রেশম অণুরা নিজেদের মধ্যে বিশেষ সজ্জা তৈরি করে ব’লেই তারা এমন শক্তপোক্ত হয়। এমনকি যে পদ্মপাতায় জল নিয়ে আমাদের এত কথা, কবিতা; আসলে পদ্মপাতার উপরে থাকা অসংখ্য ন্যানো আকৃতির গঠনই এর উপর দিয়ে জলের ফোঁটাকে গড়িয়ে যেতে দেয়।

প্রাচীনকালের বড়ো বড়ো সাম্রাজ্যগুলো তাদের অগুনতি অত্যাশ্চর্য সুবিশাল স্থাপত্য বা প্রযুক্তিগত কীর্তির মাধ্যমে সারা বিশ্বের সমীহ আদায় ক’রে নিয়েছিল। পেরুর মাচু পিচু হোক বা মিশরের পিরামিড অথবা গ্রীসের পার্থেনন এখনও আমাদের মনে সমান বিস্ময় জাগিয়ে তোলে। কিন্তু এসব বৃহদাকার জিনিসের পাশাপাশি তাঁরা যে ছোটখাটো জিনিস বানানোতেও প্রবল দক্ষ ছিলেন, এ-কথা হয়তো আমরা মাঝেমধ্যে ভুলে যাই। রোমের বিখ্যাত লাইকরগাস পেয়ালার কথা আলোচনা করলেই এ-বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাবে। আনুমানিক ৪০০ খ্রীষ্টাব্দের এই অসামান্য কারুকাজ করা কাচের পাত্রতে আলো ফেললেই নানা রঙের যাদু দেখা যেত। বিভিন্ন দিক থেকে ফেলা আলোতে কখনও লাল, আবার কখনও সবুজ বর্ণ ধারণ করত এটি। কারণ এই কাচে রয়েছে সোনা এবং রুপোর তৈরি সংকর ন্যানোবস্তু! ‘মায়া ব্লু’ নামে পরিচিত ক্ষয়রোধী এক নীলরঙের পদার্থ এমন আরেকটা ন্যানোবস্তু, যা হাজার হাজার বছর ধ’রে মেক্সিকো-সহ দক্ষিণ আমেরিকার নানা শিল্পীর সৃষ্টিতে কাজে লেগে আসছে। প্রায় ৮০০ খ্রীষ্টাব্দ থেকেই এর ব্যবহার হয় ব’লে বিজ্ঞানীদের ধারণা। মায়া নগরী চেচেন ইতজা-তে কিছু ছবিতে দেখা গেছে গুঁড়ো নীলের ‘ডাই’-এর সঙ্গে এতে মিশ্রিত হয়েছে এক বিশেষ ধরণের ন্যানোছিদ্র যুক্ত মাটি যার নাম ‘প্যালিগোরস্কাইট’। এই দুইয়ের রাসায়নিক বন্ধনের ফলেই তৈরি হত এমন অদ্ভুত ‘চিরস্থায়ী’ রঙ! ৩০০ থেকে প্রায় ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দ অবধি মধ্যপ্রাচ্যের দামাস্কাসের ইস্পাত তরবারির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ এর অতুলনীয় শক্তি, প্রতিরোধক্ষমতা আর অবিশ্বাস্য তীক্ষ্ণ ধার! সম্প্রতি আণুবীক্ষণিক যন্ত্রের নজরে এসেছে এই তরোয়ালের প্রান্তে রয়েছে বহু সংখ্যক ন্যানো-তার বা ন্যানো-চোঙের মতো আকৃতি যারা এর শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মেসোপটেমিয়া থেকে কিছু সুপ্রাচীন সেরামিক পাত্র পাওয়া গেছে যেখানে মূলত তামা-সহ কিছু ধাতব পদার্থের ন্যানোমাত্রার প্রলেপ রয়েছে। যার ফলে এগুলো ভীষণ চকচকে আর দীপ্তিময় হয়ে উঠত। এসময়ে এদের রঙ লাল থেকে সবুজাভ নীলে পরিবর্তিত হত (চিত্র দ্রষ্টব্য)। TEM (ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি)-র সাহায্যে তোলা

কিন্তু তাই ব’লে এসব সামগ্রীর নির্মাতারা প্রত্যেকেই ন্যানোপ্রযুক্তির জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন এমনটা ভাবা সমীচীন নয় খুব একটা। অত্যন্ত দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা যে আসলে অজান্তেই ন্যানোস্কেলের জিনিসপত্র বানিয়ে ফেলছেন এটা তাঁরা বোঝেন নি। দুঃখের বিষয়, বর্তমানে, যখন আধুনিক মানুষ ন্যানোসায়েন্সের জ্ঞানে প্রাজ্ঞ, ন্যানোপ্রযুক্তির বলে বলীয়ান, আণুবীক্ষণিক মাত্রায় গবেষণা অনেক সহজতর, তখন হারিয়ে গিয়েছে এইসব প্রাচীন বিষয়বস্তুর প্রস্তুতির কৌশল। এখন চেষ্টা ক’রেও একটা দামাস্কাসের তরবারি বা লাইকরগাস পেয়ালা বানাতে পারছি না আমরা। একদিন হয়তো পারব ঠিক।

এ তো গেল না-পারার কথা। এবার আমরা এতদিনে এই ন্যানোপ্রযুক্তির হাত ধ’রে কী কী করতে পেরেছি একটু দেখা যাক! ১৯৮১ সালে আবিষ্কার হয় স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ (STM)। পারমাণবিক স্তরের ছবি তুলতে যার জুড়ি নেই। আর ১৯৮৫-তে আবিষ্কার হয় ফুলারিন অণু (C60)। বলের মতো আকৃতি ধারণ করে ব’লে বাকমিন্সটার ফুলারিন-কে ‘বাকি বল’ (bucky ball) বলা হয়।

তবে বাণিজ্যিকভাবে দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক ব্যবহার করতে আরও বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। নতুন সহস্রাব্দের সূচনালগ্নে ২০০০ সালের আশেপাশে ন্যানোবস্তুর সাহায্যে তৈরি হওয়া কিছু সাধারণ সামগ্রীর প্রচলন হয়। যেমন রুপোর ন্যানোবস্তুর সাহায্যে কিছু জীবাণুনাশক তৈরি করা হয়, আমাদের ব্যবহৃত স্বচ্ছ সানস্ক্রিন লোশনেও রয়েছে অসংখ্য ন্যানোবস্তুকণা। আর কার্বন ন্যানোটিউবের (কার্বনের ন্যানো অবস্থার ফুলারিন গোষ্ঠীর অন্তর্গত বিশিষ্ট বহুরূপের অণুর সাহায্যে বানানো চোঙাকৃতি গঠন, যে চোঙের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত প্রায় ১৩,২০,০০,০০০ : ১) ব্যবহার ক’রে দাগ-প্রতিরোধী কাপড় বানানো হয় এ সময়েই। এদের সাহায্যে পরবর্তীকালে সৌরকোশ, বর্তনী সংযোগের অংশ ইত্যাদিও তৈরি করা হয়েছে। কার্বনের বহুরূপতা ধর্মকে কাজে লাগিয়ে ফুলারিন বা কার্বন ন্যানোটিউবের পাশাপাশি বানানো হয়েছে গ্রাফিন বা মাত্র একপরমাণু উচ্চতাবিশিষ্ট কার্বনের চাদর। যার পরিবহন ক্ষমতা অতুলনীয়। পলিমার আর সেরামিক শিল্পেও ন্যানোর জয়যাত্রা শুরু হয়। একবার যখন মানুষ এর মজাটা বুঝতে পারল, আর পিছন ফিরে তাকালো না। ভীষণ দ্রুতগতিতে এবার ন্যানোপ্রযুক্তির ব্যাপ্তি বাড়তে লাগলো। ২০০৫ সালের মধ্যেই চিকিৎসা জগতে আলোড়ন ফেলে চ’লে এল বিভিন্ন ক্ষুদ্র ‘বায়ো যন্ত্র’, ‘লক্ষ্য নির্দেশক ওষুধ’ যারা শরীরের প্রত্যন্ত কোণায় নির্ভুলভাবে পৌঁছে দেবে নিরাময়ের চাবিকাঠি, সবই ন্যানোপ্রযুক্তির দৌলতে। আর অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিন যন্ত্রাদির ক্ষেত্রে বলতে গেলে তো ন্যানোসায়েন্স বা প্রযুক্তি ছাড়া এসবই অচল! ত্রিমাত্রিক ট্রান্সিস্টর হোক বা বিবর্ধক অথবা প্রায় একমাত্রিক পাতলা বৈদ্যুতিন বর্তনী, সবেতেই এর অবদান।

এবার আসা যাক ন্যানোপ্রযুক্তির দুটো মূল পদ্ধতির বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায়। প্রথমটা হল নিচে থেকে ওপরে পদ্ধতি( bottom up)। এখানে আগে কোনো পদার্থের পরমাণু বা অণু নির্বাচন করা হয়। তারপর ক্রমে তারা নিজেরা জুড়ে জুড়ে স্ব-সমাবেশ গঠনের মাধ্যমে অভীষ্ট ন্যানোবস্তু তৈরি ক’রে ফেলে। ন্যানো লিথোগ্রাফি বা ওয়াটসন-ক্রীক জোড় গঠনে এই পদ্ধতি কাজে আসে। এটা খরচের দিক থেকে বেশ সুবিধাজনক। দ্বিতীয় প্রক্রিয়ার নাম ওপর থেকে নিচে (top down)। এক্ষেত্রে কোনো জিনিসকে প্রাথমিকভাবে বড়সড় আকারে নিয়ে ধীরে ধীরে তাকে ন্যানোমাত্রায় নিয়ে যেতে হয়। এটা অপেক্ষাকৃত ব্যয়সাধ্য আর কম ব্যবহৃত পদ্ধতি। ন্যানো জগতের আশ্চর্য দুনিয়ায় প্রবেশ করলে আমাদের মনে হয় এ যেন অন্য এক পৃথিবী! পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, প্রযুক্তিবিদ্যা, কম্পিউটার বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান অথবা আণুবীক্ষণিক জীববিদ্যার মতো বিজ্ঞান প্রযুক্তির সমস্ত আনাচকানাচেই ছড়িয়ে পড়ছে এর যাদু। নতুন যুগের চালিকাশক্তি হয়ে দেখা দিয়েছে এই ক্ষুদ্রমাত্রার অমোঘ বিজ্ঞান। আক্ষরিক অর্থেই এ এক বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন। আজ এই আলোচনায় আমরা শুধু সেই সমুদ্রের এক কণার পরিচয় পেলাম মাত্র।

ঋণ স্বীকারঃ

1) www.google.co.in
2) https://www.wikipedia.org
3) https://www.intechopen.com/
4) http://trynano.org/
5) https://www.theguardian.com/nanotechnology-world/nanotechnology-is-ancient-history
6) https://www.ttu.ee
7) http://www.nanotech-now.com/news.cgi?story_id=43223

One thought on “ন্যানোজগতঃ বিন্দুতে সিন্ধু

  1. Semanti Mukhopadhyay

    খুব ভালো লাগলো। সহজভাবে অনেক কঠিন বিষয় লিখেছো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 + 17 =