পরমাণু পিঞ্জরে বন্দি অতিশীতল তরল

পরমাণু পিঞ্জরে বন্দি অতিশীতল তরল

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বিজ্ঞানের পাঠ্যবই আমাদের শেখায়, পদার্থের তিনটি দশা : কঠিন, তরল, গ্যাস। গলিত দশায় সবকিছু অস্থির, আবার জমাট বাঁধলে স্থির। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে, এই ছবি অসম্পূর্ণ। একটি তরল পুরোপুরি গলে গেলেও, তার ভেতরের কিছু পরমাণু অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, যতই তাপ বাড়ানো হোক না কেন। আর এই স্থির পরমাণুগুলিই ঠিক করে দেয়, একটি তরল কীভাবে আবার কঠিনে রূপান্তরিত হবে। এমনকি তারা জন্ম দিতে পারে এক আজব দশার। তার নাম “করালড সুপারকুলড লিকুইড” বা পিঞ্জরাবদ্ধ অতি-শীতলীকৃত তরল। সে দশায় তরল আটকে থাকে নিজেরই পরমাণুর খাঁচায়। এই আবিষ্কারের পেছনে রয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম এবং জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব উলম-এর গবেষকরা। গবেষণাটিতে ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করা হয়। তাঁরা ধাতব ন্যানো-ড্রপলেট, প্লাটিনাম, সোনা, প্যালাডিয়াম গলিয়ে আবার সেগুলি ঠান্ডা হওয়ার মুহূর্তটি ধরে ফেলেন। কেন এই “কঠিনীভবন” বা সলিডিফিকেশন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ প্রকৃতির অগণিত প্রক্রিয়ার ভিত এটাই। খনিজ তৈরি হয় এতে, বরফ বাড়ে এতে, প্রোটিন ভাঁজ খায় এতে। শিল্পেও এর দাপট কম নয়। ওষুধ তৈরিতে নিয়ন্ত্রিত কঠিনীভবন দরকার। বিমানের ধাতু থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক চিপ, সবখানেই। অথচ তরল দশা আজও বিজ্ঞানের কাছে সবচেয়ে ধোঁয়াটে। নটিংহ্যামের অধ্যাপক আন্দ্রেই খেলাবিস্তভ বলছেন, “গ্যাস আর কঠিনে পরমাণুর আচরণ তুলনামূলকভাবে বোধগম্য। কিন্তু তরল এখনও রহস্যে মোড়া।“ তরলের ভেতরে পরমাণুর চলাচল যেন ভিড় বাসে মানুষের ধাক্কাধাক্কি। সবাই নড়ছে চড়ছে, কিন্তু নিয়মের বালাই নেই। আর ঠিক সেই কারণেই তরল থেকে কঠিনে বদলে যাওয়ার ক্ষণটা ধরতে পারা এত কঠিন। এই গবেষণায় ধাতব ন্যানোকণা রাখা হয়েছিল এক-পরমাণু-পুরু গ্রাফিনের উপর। গ্রাফিন এখানে চুলোর মতো কাজ করেছে: তাপও দিয়েছে, আবার ধরে রাখার জায়গাও। গলা মাত্রই ধাতুর পরমাণুগুলো ছুটোছুটি শুরু করে। কিন্তু গবেষকরা হতবাক হয়ে দেখেন, সব পরমাণু ছুটছে না। কিছু পরমাণু একেবারে স্থির। ড. ক্রিস্টোফার লাইস্ট, যিনি উলমে এই মাইক্রোস্কোপি পরীক্ষাটি চালান, তিনি বলেন, এই অনড় পরমাণুগুলো গ্রাফিনের নির্দিষ্ট খুঁতযুক্ত স্থানে শক্তভাবে আটকে আছে। তাপমাত্রা যতই বাড়ুক, বন্ধন ছুটছে না। আরও চমকপ্রদ বিষয় হল, ইলেকট্রন রশ্মিগুচ্ছ ফোকাস করে গবেষকরা ইচ্ছে মতো নতুন খুঁত তৈরি করতে পেরেছেন। অর্থাৎ, কতগুলো পরমাণু আটকে থাকবে তা নিয়ন্ত্রণযোগ্য। এখানেই বিজ্ঞানের এক চলচ্চিত্র সুলভ মুহূর্ত। অধ্যাপক উটে কাইজার বলছেন, এই পরীক্ষায় তাঁরা সরাসরি ইলেকট্রনের তরঙ্গ-কণা দ্বৈত চরিত্র দেখেছেন। একদিকে ইলেকট্রন তরঙ্গের মতো কাজ করে ছবি তোলে, অন্যদিকে কণার মতো আচরণ করে পরমাণুকে ধাক্কা দেয়, আবার কখনো কখনো স্থিরও করে দিয়ে অবাক করে। এর ফলেই আবিষ্কৃত হলো পদার্থের এক নতুন দশা। যখন মাত্র কয়েকটি পরমাণু আটকে থাকে, তখন তরল ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে কেলাস হয়ে যায়। কিন্তু যখন অনেক পরমাণু মিলিয়ে তরলের চারপাশে এক ধরনের পরমাণু-বলয় তৈরি হয়, তখন দৃশ্যপট যায় বদলে । তরলটি যেন খাঁচাবন্দি হয়ে পড়ে। ফল? প্লাটিনাম ৩৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, নিজের স্বাভাবিক হিমাঙ্কের চেয়ে হাজার ডিগ্রি কম তাপেও তরলই থেকে যায়। শেষ পর্যন্ত ঠান্ডা হলে সেটি কেলাস হয় না। হয় অনিয়তাকার ধাতু, যার কোনো নিয়মিত পরমাণু বিন্যাস নেই। এই অবস্থাটা ভীষণ অস্থির। খাঁচা ভাঙলেই ধাতু ঝটপট নিজের চেনা কেলাস রূপে ফিরে যায়। এই আবিষ্কারের তাৎপর্য শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়। প্লাটিনাম-অন-কার্বন বিশ্বের এক সবচেয়ে ব্যবহৃত অনুঘটক। নটিংহ্যামের ক্যাটালিসিস বিশেষজ্ঞ ড. জেসাম আলভেস ফার্নান্দেস বলছেন, এই “সংকর ধাতব দশা” আমাদের অনুঘটকের কাজ বোঝার ধরনই বদলে দিতে পারে। ভবিষ্যতে আসতে পারে স্বয়ং-পরিষ্কার, বেশি টেকসই অনুঘটক। এতদিন ন্যানোস্কেলে পিঞ্জরাবদ্ধতা দেখা গিয়েছিল শুধু ফোটন আর ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে। এই প্রথম পরমাণুকেই খাঁচায় পুরল বিজ্ঞান। খ্লোবিস্তভের কথায়, “আমরা হয়তো এমন এক নতুন ধরনের পদার্থের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে যেখানে কঠিন আর তরল একসঙ্গে বাস করে।“ আগামী লক্ষ্য, এই পরমাণু- পিঞ্জরকে আরও বড়, আরও বিশ্লেষণ করা। যদি তা সম্ভব হয়, তবে বিরল ধাতুর ব্যবহার কমিয়ে শক্তি সংরক্ষণ ও রূপান্তরের প্রযুক্তিতে এক নতুন অধ্যায় খুলে যেতে পারে।

 

সূত্র: “Stationary Atoms in Liquid Metals and Their Role in Solidification Mechanisms” by Christopher Leist, Sadegh Ghaderzadeh, Emerson C. Kohlrausch, Johannes Biskupek, Luke T. Norman, Ilya Popov, Jesum Alves Fernandes, Ute Kaiser, Elena Besley and Andrei N. Khlobystov, 9 December 2025, ACS Nano.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + fourteen =