আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির পেছনে রসায়নের অবদান অপরিসীম। কিন্তু সেই অগ্রগতির ক্ষতচিহ্ন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণ, বিষাক্ত বর্জ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে আমাদের মাথা পেতে মেনে নিতে হয়েছে। এই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিন শহরের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী এমন একটি নতুন রাসায়নিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যা ওষুধ ও শিল্পজাত রাসায়নিক তৈরির ধরণই বদলে দিতে পারে।
এই অভিনব গবেষণাটি সম্প্রতি নেচার কেমিস্ট্রি-তে প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল কার্বন–কার্বন বন্ধন তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়া—ক্রস-কাপলিংকে আরও নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করা। এটি এক অনুঘটক-নির্ভর রাসায়নিক বিক্রিয়া, যার মাধ্যমে দুটি পৃথক জৈব যৌগকে যুক্ত করে নতুন কার্বন–কার্বন বন্ধন গঠন করা হয়। এই বন্ধন ছাড়া আধুনিক ওষুধ তৈরি করার কথা কল্পনাই করা যায় না; অ্যাসপিরিন থেকে শুরু করে অ্যালার্জির ওষুধ (আন্টি-হিস্টামিন)—প্রায় সবই এর ওপর নির্ভরশীল। প্রচলিত পদ্ধতিতে এই বিক্রিয়ার জন্য বিপজ্জনক ও স্পর্শকাতর জৈব-ধাতব যৌগ ব্যবহার করতে হয়। এটি ব্যয়বহুল , বিপজ্জনক এবং বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক বর্জ্য সৃষ্টি করে।
এই চেনা পথে হাঁটার বদলে অধ্যাপক মাইকেল ক্রিশে ও তাঁর গবেষক দল বেছে নিয়েছেন এক ভিন্ন ও সাহসী কৌশল। তাঁরা ব্যবহার করেছেন সোডিয়াম ফর্মেটের মতো একটি সহজলভ্য, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক পদার্থ। এই উপাদানটি হাইড্রোজেন স্থানান্তরের মাধ্যমে সরাসরি বিক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যায়, ফলে প্রচলিত বিপজ্জনক ধাপগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
গবেষণার অগ্রগতির পথে বিজ্ঞানীরা একের পর এক বিস্ময়কর তথ্যের মুখোমুখি হন। যে উপাদানটিকে প্রথমে অপরিহার্য বলে মনে করা হচ্ছিল—লিগ্যান্ড—তার আসলে কোনো প্রয়োজনই নেই। বরং প্যালাডিয়াম ডাইমার নামক একটি অনুঘটকই বিক্রিয়াটিকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে পরিচালনা করে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বিক্রিয়ায় সহ-দ্রাবক হিসেবে জল ব্যবহৃত হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি আরও পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠেছে।
এই পদ্ধতি শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়; শিল্পক্ষেত্রেও এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই ওষুধ প্রস্তুতকারক শিল্পগুলো এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। গবেষণার প্রথম লেখক ইউনের চো বলেন, তাঁরা একটি বহুব্যবহৃত রাসায়নিক বিক্রিয়াকে আরও নিরাপদ করে তুলেছেন তার কার্যকারিতা বজায় রেখেই।
দীর্ঘ দুই দশকের গবেষণায় মাইকেল ক্রিশে হাইড্রোজেন-ভিত্তিক রসায়নের ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছেন, যার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি সম্প্রতি ইয়ামাদা–কোগা পুরস্কার অর্জন করেছেন। এই গবেষণা সেই ধারাবাহিকতারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কেবল একটি আবিষ্কার নয়— এটি পরিষ্কার, বুদ্ধিদীপ্ত ও টেকসই রসায়নের ভবিষ্যতের দিকে এক সাহসী সূচনা।
সূত্র: New Chemical Discovery Could Make Medicine and Manufacturing More Sustainable by Esther Robards-Forbes, March 11, 2025.
