সমতলের তুলনায় উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার তুলনামূলকভাবে কম। এমনটা হওয়ার কারণ কী? এই বিষয়টা বেশ কিছু বছর ধরেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহল জাগিয়েছে। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের গ্ল্যাডস্টোন ইন্সটিটিউটের গবেষকেরা এর জৈবিক ব্যাখ্যা উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁদের সাম্প্রতিক গবেষণার বিবরণটি প্রকাশিত হয়েছে সেল মেটাবোলিজম পত্রিকায়। এখানে বলা হয়েছে, কম অক্সিজেনযুক্ত পরিবেশে আমাদের লোহিত রক্তকণিকা এক নতুন বিপাকীয় ধাঁচে নিজেকে পরিবর্তন করে। তখন তারা রক্ত থেকে বিপুল পরিমাণ গ্লুকোজ শুষে নিয়ে এক ধরনের “শর্করা শোষক স্পঞ্জে” পরিণত হয়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
গবেষণার নেতৃত্ব দেন বায়োকেমিস্ট ইশা জেইন। তাঁর দল বহুদিন ধরে ‘হাইপোক্সিয়া’ অর্থাৎ রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা নিয়ে কাজ করছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, কম অক্সিজেনযুক্ত পরিবেশে রাখা ইঁদুরদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যায়। খাবার খাওয়ার পর তাদের শরীর দ্রুত রক্ত থেকে শর্করা সরিয়ে ফেলতে পারে। প্রথমে ধারণা হয়েছিল, পেশি, যকৃত কিংবা মস্তিষ্ক এই গ্লুকোজ ব্যবহার করছে। কিন্তু বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূল কাজটি করছে লোহিত রক্তকণিকাই।
আরও আশ্চর্যের বিষয়, কম অক্সিজেনের পরিস্থিতিতে শরীর শুধু যে বেশি সংখ্যক লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করে তাই নয়, প্রতিটি কোষই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গ্লুকোজ গ্রহণ করে। এই গ্লুকোজ ব্যবহার করে তারা এমন একটি অণু তৈরি করে, যা কোষকলায় অক্সিজেন সরবরাহকে আরও কার্যকর করে তোলে। অর্থাৎ, উচ্চ স্থানে বেঁচে থাকার অভিযোজন প্রক্রিয়াই একই সঙ্গে রক্তে শর্করা কমিয়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস করছে।
এই গবেষণাটি এখানেই থেমে থাকে নি। আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বিজ্ঞানীরা ‘HypoxyStat’ নামে একটি পরীক্ষামূলক ওষুধ তৈরি করেছেন, যা কৃত্রিমভাবে কম অক্সিজেনের প্রভাব সৃষ্টি করে। ইঁদুরের ডায়াবেটিস মডেলে এই ওষুধ রক্তে শর্করার মাত্রা একেবারে স্বাভাবিক করে দেয়। প্রচলিত চিকিৎসার চেয়েও এ ফল ভালো। এতে বোঝা যায়, ভবিষ্যতে লোহিত রক্তকণিকাকে ‘গ্লুকোজ স্পঞ্জ’ হিসেবে ব্যবহার করে ডায়াবেটিসের নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
এই আবিষ্কার কেবল ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেই নয়, ব্যায়াম-শারীরবিদ্যা, ট্রমা-পরবর্তী হাইপোক্সিয়া এবং অন্যান্য বিপাকীয় রোগকে অনুধাবন করার ক্ষেত্রেও গভীর তাৎপর্যবহ। সামগ্রিকভাবে, এই গবেষণাটি দেখাল—অক্সিজেনের স্বল্পতা মোকাবিলায় শরীরের অভিযোজন ক্ষমতা আমাদের বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। আর শরীরের অদৃশ্য অভিযোজন প্রক্রিয়াগুলোই কখনও কখনও সবচেয়ে বড় চিকিৎসা-সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।
সূত্র: Red blood cells serve as a primary glucose sink to improve glucose tolerance at altitude by Yolanda Martí-Mateos, Zohreh Safari,et.al; published in Cell Metabolism, 2026; DOI: 10.1016/j.cmet.2026.01.019
