পিঁপড়েদের চান্দ্র কম্পাস 

পিঁপড়েদের চান্দ্র কম্পাস 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৯ মার্চ, ২০২৬

প্রকৃতিতে দিক নির্ধারণের জন্য আকাশের জ্যোতিষ্কগুলো বহু প্রাণীর কাছে এক অনন্য দিশারি। দিনের বেলায় সচল প্রাণীরা চলাচল বা অভিবাসনের সময় দিক নির্ধারণের জন্য সূর্যকে একটি প্রাকৃতিক কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে। সূর্যের অবস্থান আকাশে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হওয়ায় প্রাণীরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে সেই পরিবর্তনের মিল রেখে সঠিক দিক বজায় রাখতে পারে। অর্থাৎ, তারা সূর্যের গতিকে সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে বুঝে নিয়ে নিজের পথ ঠিক রাখে।

কিন্তু নিশাচর প্রাণীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতিটা বেশ জটিল। তারা চাঁদের আলোকে দিকনির্দেশের জন্য ব্যবহার করে। কিন্তু সূর্যের তুলনায় চাঁদ অনেক বেশি অনিশ্চিত। চাঁদের ওঠার সময়, আকার এবং আকাশে তার গতিপথ প্রতি মাসে পরিবর্তিত হয়। তাহলে প্রশ্ন, নিশাচর প্রাণীরা কি সত্যিই চাঁদের এই পরিবর্তনশীল গতিপথ অনুমান করে সঠিক পথ খুঁজতে পারে?

সাম্প্রতিক গবেষণায় এই প্রশ্নের এক বিস্ময়কর উত্তর পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়ার এক নিশাচর প্রজাতির পিঁপড়ে ‘Myrmecia midas’-কে সাধারণভাবে বুল অ্যান্ট বলা হয়। তারা চাঁদের আলো ব্যবহার করে একটি বিশেষ ধরনের সময়-সমন্বিত চান্দ্র কম্পাস তৈরি করতে পারে। এরা খাবারের সন্ধানে দূরে যাওয়ার পর বাসায় ফিরে আসার সময় একটি পথ সমন্বয়ের (“পাথ ইন্টিগ্রেটর’’) পদ্ধতি ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে তারা পথের দূরত্ব আর দিক একত্রে হিসাব করে রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই দিক নির্ণয়ের ব্যবস্থাকে ঠিক রাখতে তারা চাঁদের অবস্থান সম্পর্কে একটি অভ্যন্তরীণ পূর্বাভাস ব্যবহার করে। এই পূর্বাভাসকে বলা যায় এক ধরনের চান্দ্র পঞ্জিকা বা লুনার এফেমেরিস ফাংশন । অর্থাৎ চাঁদের আকাশে ওঠা নামার গতিপথ সম্পর্কে মস্তিষ্কে তৈরি একটি ধারণা। পিঁপড়েগুলো চাঁদের ধীরগতির ওঠানামাকে একটি সরলরৈখিক অনুমানের মাধ্যমে হিসাব করে। তবে যখন চাঁদ আকাশের মাঝামাঝি সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়, তখন পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে দ্রুত পরিবর্তনের একটি বিশেষ ধাপ ঘটে, যাকে গবেষকেরা “স্পিড-স্টেপ” বলে উল্লেখ করেছেন।

এই পূর্বাভাস অবশ্য সবসময় পুরোপুরি নিখুঁত হয় না। বিশেষ করে চাঁদ যখন আকাশের শীর্ষে, তখন প্রতিরাতে তার গতিপথে সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। ফলে সেই সময়ে পিঁপড়েদের অনুমানের নির্ভুলতা কিছুটা কমে যেতে পারে। আরও দেখা গেছে যে তারা মাঝে মাঝে তাদের এই চান্দ্র-কম্পাসকে দিগন্তের দৃশ্যপটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। অর্থাৎ আশেপাশের গাছ, পাহাড় বা দিগন্তরেখাকে তারা একটি স্থির সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে দিক ঠিক করে।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই চাঁদভিত্তিক পূর্বাভাস সম্ভবত তখনই শুরু হয় যখন পিঁপড়েরা প্রথমবার রাতে চাঁদ দেখতে পায়। এরপর পুরো রাত জুড়ে তারা সেই তথ্য ব্যবহার করে নিজের পথ নির্ধারণ করে।

 

নিশাচর প্রাণীরা শুধু চাঁদের আলো অনুসরণই করে না, বরং তার জটিল গতিপথ সম্পর্কে সময়ভিত্তিক পূর্বাভাস তৈরি করে। এই গবেষণাটি প্রাণীদের দিকনির্ণয়ের কৌশল সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে নতুনভাবে সমৃদ্ধ করে এবং প্রমাণ করে যে প্রকৃতির ক্ষুদ্র প্রাণীরাও অত্যন্ত উন্নত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সংকেত ব্যবহার করতে পারে।

 

সুত্র: Nocturnal ants navigate using a time-compensated lunar compass by Cody A. Freas, cody.freas@utoulouse.fr ∙ Ken Cheng , published in a cell press journal current biology, 10th March 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × two =