প্রাগৈতিহাসিক মানুষের শিকার কৌশলকে আমরা এতদিন দেখেছি পাথর, শক্তি আর সাহসের কাহিনী হিসেবে। কিন্তু আফ্রিকায় ৬০,০০০ বছরের পুরোনো একগুচ্ছ তীরের ফলার উপর বিষাক্ত উদ্ভিজ্জ রাসায়নিকের চিহ্ন সেই গল্পকে আমূল বদলে দিচ্ছে। জানাচ্ছে , পুরাপ্রস্তর যুগের এই শিকারিরা শুধু শক্তিশালী ছিল না, তারা ছিল বিপজ্জনকভাবে বুদ্ধিমান। সায়েন্স অ্যাডভান্স-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় সরাসরি রাসায়নিক প্রমাণ পাওয়া গেছে যে প্রাগৈতিহাসিক মানুষ শিকারে বিষ ব্যবহার করত। এটাই এখনও পর্যন্ত পাওয়া প্রাচীনতম রাসায়নিক প্রমাণ। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ মার্লিজ লম্বার্ডের কথায়, বিষ মাখানো তীর বানানো মানে যেন “এক জটিল পাক প্রণালী অনুসরণ করা”, যেখানে ভুল হলে খাবার নষ্ট, মৃত্যু অনিবার্য। বিষ সংগ্রহ, তা নিরাপদে প্রক্রিয়াজাত করা, নিজে বিষক্রিয়া এড়িয়ে বিষকে অস্ত্রে প্রয়োগ করা, তারপর সেই অস্ত্র দিয়ে শিকার করে আহত প্রাণীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুসরণ করা, এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই তো উচ্চস্তরের পরিকল্পনা – ফল বোঝার ক্ষমতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রমাণ। লম্বার্ডের মতে, এমন কাজ কেবল শক্ত হাতে নয়, তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কেই সম্ভব। অন্য প্রত্নতত্ত্ববিদ জাস্টিন ব্র্যাডফিল্ড বিষয়টিকে আরও পরিষ্কার করে বলেন, এটি “উন্নত পরিকল্পনা, কৌশল এবং কার্য কারণগত যুক্তিবোধের” সরাসরি প্রমাণ। এত প্রাচীন মানুষের পক্ষে এমন মানসিক সক্ষমতা দেখানো কঠিন, কিন্তু এর প্রমাণ প্রতি বছরই বাড়ছে। এর আগেও গবেষকরা ধারণা করেছিলেন যে প্রায় ৭০,০০০–৬০,০০০ বছর আগে, তীর-ধনুকের মতো দূরপাল্লার অস্ত্র আবিষ্কারের সময়েই বিষের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। কারণ সেই সময়ের অনেক পাথরের ফলাই এত ছোট ছিল যে বিষ ছাড়া বড় প্রাণীকে মারার ক্ষমতা তাদের ছিল না। কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই : বিষের রাসায়নিক প্রমাণ। অধিকাংশ জৈব বিষ সময়ের সঙ্গে ভেঙে যায়। ৬০,০০০ বছর ধরে কোনো জৈব অণু টিকে থাকা প্রায় অলৌকিক ব্যাপার। এই অবিশ্বাস্য ঘটনাই ঘটেছে দক্ষিণ আফ্রিকার কোয়াজুলু–নাটালের উমলাটুজানা শিলাস্তরে। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈবাণু প্রত্নতত্ত্ববিদ স্বেন ইসাকসন ও তাঁর দল সেখানে পাওয়া ১০টি ক্ষুদ্র পাথরের ফলা পরীক্ষা করেছেন। প্রায় এক সেন্টিমিটার মাপের এই ফলাগুলোর মধ্যে পাঁচটিতে পাওয়া গেছে বুপহানড্রিন নামের এক ভয়ংকর বিষাক্ত যৌগ। এই বুপহানড্রিন পাওয়া যায় বুফন ডিস্চিটা নামের স্থানীয় উদ্ভিদে। একে ‘পয়জন বাল্ব’ বা ‘গিফবোল’ বলা হয়। গাছটির মূল থেকে নিঃসৃত দুধের মতো তরলের অল্প পরিমাণই আধঘণ্টার মধ্যে ইঁদুর মেরে ফেলতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে এটি বমি, শ্বাসরোধ এবং কোমা পর্যন্ত ঘটাতে পারে। এই একই রাসায়নিক পাওয়া গেছে ১৭০০ শতকে সংগৃহীত চারটি ঐতিহাসিক তীরের ফলাতেও। আজও দক্ষিণ আফ্রিকার আদিবাসী শিকারিরা ছোট ছোট বিষাক্ত তীর দিয়ে স্প্রিংবক, কুডু, এমনকি জেব্রা বা জিরাফও শিকার করে। লম্বার্ডের কথায়, “উমলাটুজানার শিকারিরা যে একই কাজ করত না, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।” গবেষকরা মনে করেন, তীরের বিষে হয়তো আরও উপাদান ছিল সাপ বা মাকড়সার বিষ, যেগুলো কালে নষ্ট হয়ে গেছে। ইসাকসনের আগের গবেষণা, যেখানে তিনি ১,০০০ বছর পুরোনো তীর নিয়ে বিশ্লেষণ করেছিলেন, এই দীর্ঘস্থায়ী উদ্ভিজ্জ বিষ চিহ্নিত করতে সাহায্য করেছে। এর আগে বিষাক্ত তীরের প্রাচীনতম রাসায়নিক প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল ৬,৭০০ বছর পুরোনো একটি হাড়ের তীর থেকে। এখন সেই সময়রেখা এক লাফে প্রায় দশ গুণ পিছিয়ে গেল। এটি প্রাগৈতিহাসিক মানুষের উদ্ভিদজ্ঞান, পরীক্ষানিরীক্ষা এবং প্রাকৃতিক রসায়নের গভীর বোঝাপড়ার দলিল। কানাডার ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ এপ্রিল নওয়েলের কথায়, “এ আসলে আমাদের উদ্ভিদ-জ্ঞান নিয়ে রচিত এক ইতিহাস।” রান্না, ওষুধ, রং- সব কিছুরই আগে ছিল এই হাজার হাজার বছরের বিপজ্জনক পরীক্ষা। ৬০,০০০ বছর আগের সেই তীরের ফলা তাই নিছক পাথর নয়, মানবমস্তিষ্কের ধারালো প্রমাণ। সেখানে বিজ্ঞান, ভয় আর বুদ্ধি একসঙ্গে মিশে আছে।
