পৃথিবীর গভীরে কম্পনের দৌড়

পৃথিবীর গভীরে কম্পনের দৌড়

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬

ভূমিকম্প সাধারণত কিছু কঠোর নিয়ম মেনে চলে। অতিরিক্ত তাপ, প্রবল চাপ আর নরম হয়ে যাওয়া শিলা—এই তিনের সম্মিলনে পৃথিবীর গভীর স্তরে বড় ফাটল বেশি দূর ছড়াতে পারে না। তাই বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে নিয়েছিলেন, এমনতর গভীর ভূমিকম্পের একটা প্রাকৃতিক সীমা আছে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে উত্তর চিলির এক ভূমিকম্প সেই সীমারেখা মুছে দিল। ১৯শে জুলাই ২০২৪ উত্তর চিলির কালামা শহরের কাছে আঘাত হানে ৭.৪ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প। বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হয়। চিলিতে ভূমিকম্প নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাধারণত সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক কম্পন ঘটে ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি জায়গায়। কালামার ঘটনাটি কিন্তু আলাদা। কারণ এই ভূ-কম্পের জন্ম পৃথিবীর অনেক গভীরে, একটি ডুবন্ত টেকটোনিক প্লেটের ভিতরে।

চিলি বসে আছে একটি সাবডাকশন জোনের উপর। যেখানে নাজকা পাত ধীরে ধীরে দক্ষিণ আমেরিকান পাতের নীচে ঢুকে যাচ্ছে।পাতের এই সংঘর্ষের দরুনই চিলি বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলের একটি। ১৯৬০ সালে এখানেই হয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, ৯.৫ মাত্রার ভূমিকম্প। কিন্তু সেই ভয়াবহ ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই ঘটেছিল তুলনামূলকভাবে অগভীর স্তরে। কালামার ভূমিকম্প কিন্তু শুরু হয় প্রায় ১২৫ কিলোমিটার গভীরে। সেখান থেকে সাধারণত ভূমিকম্পের প্রভাব ভূ-পৃষ্ঠে আসতে আসতে অনেকটাই দুর্বল হয়ে যায়। এবার কিন্তু তা হলো না। কেন এত শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেমেছিলেন অস্টিনের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেছেন, সমস্যাটা শুধু ভূ-পৃষ্ঠের ক্ষতির নয়। আসল রহস্য লুকিয়ে আছে ভূমিকম্পের ভাঙন- প্রক্রিয়ায়। ৭০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার গভীরতার ভূমিকম্পকে বলে “মধ্যম গভীরতার” ভূমিকম্প। এই স্তরে তাপ ও চাপ এত বেশি যে শিলা সাধারণত হঠাৎ ভেঙে পড়ে না। তাই বহু দশক ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, এই ধরনের ভূমিকম্প মূলত ঘটে জলশূন্যতা জনিত ভঙ্গুরতার (“ডিহাইড্রেশন এমব্রিটলমেন্ট”) কারণে। ডুবন্ত সামুদ্রিক পাতে কিছু খনিজ, যেমন- সার্পেনটাইন, তাদের কেলাস কাঠামোর মধ্যে জল আটকে রাখে। তাপ ও চাপ বাড়লে সেই জল বেরিয়ে এসে শিলার মধ্যে চাপ বাড়ায়, বন্ধন দুর্বল করে। আর তাতেই হঠাৎ ফাটল তৈরি হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়া প্রায় ৬৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পর্যন্ত কাজ করে। তার উপরে শিলার আচরণ নরম কঠিন পদার্থর মতো। সেগুলো ভাঙতে চায় না, বেঁকে যায়। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, ঐ তাপমাত্রার পরে ভূমিকম্পের ফাটল ধরা থেমে যাওয়ার কথা। অথচ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ফাটল প্রত্যাশার চেয়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার বেশি গভীরে ছড়িয়েছে ৬৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তপ্ত অঞ্চলে। গবেষকেরা সেখানে খুঁজে পান এক ভিন্ন প্রক্রিয়া- শিয়ার থার্মাল রানঅ্যাওয়ে। ভাঙনের সময় ফল্ট বরাবর প্রবল ঘর্ষণ তৈরি হয়। সেই ঘর্ষণই তীব্র তাপ উৎপন্ন করে। তাপ শিলাকে আরও দুর্বল করে, ফলে ফাটল আরও দ্রুত সরে যায়। দ্রুত সরে যাওয়া মানে আরও তাপ উৎপন্ন হওয়া। এভাবেই তৈরি হয় এক বিপজ্জনক ফিডব্যাক লুপ। ফাটল থামে না, বরং দ্রুত ছড়াতে থাকে। “চিলির এই ভূমিকম্প মধ্যম গভীরতার ভূমিকম্পের তুলনায় অনেক বেশি কম্পন তৈরি করছে,” বলেন গবেষক ঝে জিয়া। “এই প্রথম আমরা দেখলাম, একটি ভূমিকম্প ঠান্ডা অঞ্চল থেকে খুব গরম অঞ্চলে ঢুকে পড়ে আরও দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এর মানে, প্রক্রিয়াটা বদলে গেছে। ডিহাইড্রেশন থেকে থার্মাল রানঅ্যাওয়ে-তে পরিণত হয়েছে।”

তথ্য দেখায়, এই ভূমিকম্প ঘটেছে এক নাগাড়ে নয়, ধাপে ধাপে । শুরুতে ১২৫ কিলোমিটার গভীরে ঘটে ছোট ছোট ভাঙন, তার অনেকটাই কম্পন পরবর্তী অভিঘাত। পরে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার গভীরে বিশাল শক্তি নির্গত হয়, কিন্তু কম্পন পরবর্তী অভিঘাত অপেক্ষা কৃত কম। থার্মাল রানঅ্যাওয়ে তত্ত্বের সঙ্গে এই আচরণ পুরোপুরি মিলে যায়। ফাটলটি পাশের দিকে নয়, প্রায় খাড়া ভাবে নীচের দিকে ছুটে যায়, গতি সেকেন্ডে প্রায় ৪.২ কিলোমিটার। প্রায় শিয়ার ওয়েভের গতির কাছাকাছি। মধ্যম গভীরতার ভূমিকম্পে এমন গতি অত্যন্ত বিরল। এ থেকে বোঝা যায়, পৃথিবীর গভীরে, যেখানে আমরা স্থিরতা আশা করি, সেখানে লুকিয়ে থাকতে পারে আগুনের দৌড়। সেই দৌড় থামার আগেই আমাদের বুঝতে হবে তার নিয়ম। ঝুঁকি নির্ধারণের মডেলগুলিকে নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।

 

সূত্র : Deep intra-slab rupture and mechanism transition of the 2024 Mw 7.4 Calama earthquake; Zhe Jia; et.el; Nature Communication.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − seven =