প্যাকেটে-ভরা খাবার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিস্কুট, সফট ড্রিংক, প্রক্রিয়াজাত মাংস, সস, জুস- এসবেতেই থাকে নানা ধরনের খাদ্য সংরক্ষক (food preservatives)। এইসব উপাদানগুলো খাবারকে দীর্ঘদিন ভালো রাখে। কিন্তু নতুন এক বড় গবেষণা জানাচ্ছে, এই সংরক্ষক উপাদানগুলোর কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফ্রান্সের বৃহৎ নিউট্রি নেট স্যান্তে গবেষণা প্রকল্পের আওতায় অংশ নিয়েছেন ১ লক্ষের বেশি মানুষ। তাদের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য প্রায় ১৪ বছর ধরে অনুসরণ করা হয়েছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা শুরুতে ক্যান্সারমুক্ত ছিলেন। তারা নিয়মিত তাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার বিস্তারিত তথ্য দেন। কোন খাবার, কোন ব্র্যান্ড, কতটা পরিমাণে খাচ্ছেন, সবই নথিভুক্ত করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকরা ১৭ ধরনের খাদ্য সংরক্ষক উপাদান চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে পটাশিয়াম সোরবেট, সালফাইটস, সোডিয়াম নাইট্রাইট, পটাশিয়াম নাইট্রেটের মতো পরিচিত উপাদান, যা বহু প্রক্রিয়াজাত খাবারে ব্যবহৃত হয়। তবে সংরক্ষক মাত্রই ক্ষতিকর নয়। ১৭টির মধ্যে ১১টি সংরক্ষকের সঙ্গে ক্যান্সারের কোনো স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট সংরক্ষক উপাদানের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক ইঙ্গিত মিলেছে। দেখা গেছে, যাঁরা পটাশিয়াম সোরবেট বেশি গ্রহণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে মোট ক্যান্সারের ঝুঁকি কিছুটা বেশি। বিশেষ করে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে। মোট ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সালফাইটসের একটি দুর্বল কিন্তু ধারাবাহিক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাত মাংসে সোডিয়াম নাইট্রাইট ব্যবহৃত হয়। যা বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে প্রস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মোট ক্যান্সার এবং স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে যোগ পাওয়া গেছে পটাশিয়াম নাইট্রেট-এর ও। কিছু ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে অ্যাসেটিক অ্যাসিড ও অ্যাসেটেটস। গবেষকরা বলছেন, এগুলো ঝুঁকির সামান্য বৃদ্ধির জন্যই দায়ী। কিন্তু যেহেতু লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন এইসব সংরক্ষকযুক্ত খাবার খান, তাই জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এই সংরক্ষক উপাদানগুলো শরীরে ঠিক কীভাবে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, কিছু সংরক্ষক উপাদান শরীরের প্রদাহ প্রক্রিয়া বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এটি অবশ্য একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। অর্থাৎ, এটি প্রমাণ করে না যে সংরক্ষক উপাদানই ক্যান্সারের কারণ। এটুকু দেখায় যে দুয়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে এ গবেষণার সীমাবদ্ধতাও আছে। খাদ্যতথ্য অংশগ্রহণকারীদের নিজস্ব প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল, এবং সব সম্ভাব্য বিভ্রান্তিকারী কারণ পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না। তাহলে সাধারণ মানুষের কী করণীয়? গবেষকরা আতঙ্কিত হতে বলছেন না। বরং তাঁরা পরামর্শ দিয়েছেন, প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটে -ভরা খাবার কম খেতে, যতটা সম্ভব তাজা ও ঘরে রাঁধা খাবার বেছে নিতে, এবং খাবারের লেবেল পড়ে সংরক্ষকের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হতে। এখানেই প্রশ্ন, খাদ্য নিরাপত্তা নীতিতে কি সংরক্ষকের ব্যবহার নিয়ে আরও কঠোর নজরদারি দরকার? চূড়ান্ত উত্তর পেতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে একটা কথা পরিষ্কার, আমরা কী খাচ্ছি, সেটাই ধীরে ধীরে আমাদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য গড়ে দিচ্ছে।
সূত্র: Intake of food additive preservatives and incidence of cancer: results from the NutriNet-Santé prospective cohort; Science Daily.
