প্রয়াত বিশিষ্ট পদার্থবিদ টনি লেগেট 

প্রয়াত বিশিষ্ট পদার্থবিদ টনি লেগেট 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ মার্চ, ২০২৬

পদার্থবিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। মহান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ অ্যান্থনি জেমস লেগেট, যাকে অধিকাংশ বিজ্ঞানী শুধু টনি লেগেট নামেই চিনতেন, তাঁর জীবনাবসান ঘটেছে সম্প্রতি। ঘনীভূত অবস্থার পদার্থবিজ্ঞানের এই দূরদর্শী গবেষক, ২০০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। তার সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ ছিল অদ্ভুত এক কোয়ান্টাম তরলের রহস্য উন্মোচন করা। অতিপ্রবাহিতা বা সুপারফ্লুইডিটির এক বিরল রূপ, যা হিলিয়াম–৩-এ দেখা যায়। সাধারণভাবে আমরা তরলের কথা ভাবলেই মনে করি, এটি তো ধীরে বয়ে চলে। কিন্তু অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় হিলিয়াম-৩ এমন এক অদ্ভুত অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে এটি প্রায় ঘর্ষণহীনভাবে প্রবাহিত হতে পারে। যেন পদার্থ নয়, কোনো কোয়ান্টাম তরঙ্গ। এই রহস্যময় অবস্থার পেছনের কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার ব্যাখ্যা দেন লেগেট। তার তাত্ত্বিক কাজই দেখায়, কীভাবে কণাগুলি একসঙ্গে জটিল কোয়ান্টাম নৃত্যে জড়িয়ে পড়ে এবং পদার্থের একটি নতুন ধরনের অবস্থার সৃষ্টি করে। কিন্তু লেগেটের কৌতূহল সেখানেই থেমে থাকেনি। তিনি কোয়ান্টাম সুড়ঙ্গ প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে থাকেন। এটির এমন এক দিক রয়েছে, যেখানে কোয়ান্টাম কণার চলাচলের সঙ্গে জড়িত থাকে শক্তি ক্ষয় বা ডিসিপেশন। এই কাজ পরবর্তীতে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর আরও এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল, প্রস্তাবিত লেগেট–গার্গ অসমতা। এটি এমন একটি তাত্ত্বিক পরীক্ষা, যার মাধ্যমে বোঝা যায়, আমাদের দৈনন্দিন বৃহৎ জগৎ সত্যিই কোয়ান্টাম নিয়ম মেনে চলে, ন কি কোনো এক পর্যায়ে এসে ক্লাসিক্যাল বাস্তবতায় ফিরে যায়। এই প্রশ্ন আজও কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গভীর রহস্যগুলোর একটি।

লেগেটের চিন্তা ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। নব্বইয়ের দশকের গোড়াতেই তিনি ভাবছিলেন, বৃহৎ বস্তুতেও কি কোয়ান্টাম জটিল-সংযুক্তি দেখা যেতে পারে, বিশেষ করে সুপারকন্ডাক্টিভিটি বা অতিপরিবাহিতা-র মতো অবস্থায়? অথচ তখনও আধুনিক কোয়ান্টাম কম্পিউটারের যুগ শুরু হয়নি। কিন্তু আজ যখন সুপারকন্ডাক্টিং সার্কিট ব্যবহার করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হচ্ছে, তখন বোঝা যায় তার চিন্তা কতটা দূরদর্শী ছিল। তার বৈজ্ঞানিক সাহসের আরেকটি মজার উদাহরণ আছে। হিলিয়াম-৩-এর একটি অদ্ভুত পর্যায় পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি একসময় একটি তাত্ত্বিক মডেল প্রস্তাব করেন, যাকে মজা করে বলা হতো “বেকড আলাস্কা” মডেল। প্রথমে অনেকেই এটিকে প্রায় ঠাট্টা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেল, ধারণাটি মোটেও হাস্যকর নয়। এটাই ছিল লেগেটের বৈজ্ঞানিক চরিত্র। তিনি প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে ভয় পেতেন না। অদ্ভুত মনে হলেও নতুন ধারণা অনুসন্ধান করার তার সাহস ছিল। বিজ্ঞানের ইতিহাসে বড় অগ্রগতি প্রায়ই আসে এমন মানুষদের হাত ধরে, যারা শুধু গণিত বা পরীক্ষার ওপর নির্ভর করেন না, বরং গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে প্রকৃতির লুকানো নিয়মগুলো কল্পনা করার ক্ষমতা রাখেন। টনি লেগেট ছিলেন তেমনই একজন। তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তার ধারণা, তার প্রশ্ন, আর তার সাহসী চিন্তা ভবিষ্যতের পদার্থবিদ্যাকে বহুদিন ধরে পথ দেখাবে।

 

সূত্র: Ayushphy Cosmological

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 2 =