প্রাচীন শিকারি হাঙরের জীবাশ্ম

প্রাচীন শিকারি হাঙরের জীবাশ্ম

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৭ জানুয়ারী, ২০২৬

প্রায় ৩২৫ মিলিয়ন বছর আগের সমুদ্রের এক অতিকায় শিকারি হাঙর-এর জীবাশ্ম সংগ্রহ করা হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুহা ম্যামথ কেভ-এর গহনে। এই দুর্দান্ত আবিষ্কার জীবনের বহু পুরোনো অধ্যায়কে নতুন করে উন্মোচন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি ম্যামথ কেভ ন্যাশনাল পার্ক-এর একটি ৪২০+ মাইল (৬৭৫+ কিমি) লম্বা গুহা-জাল। এখানে মানুষের পা ও আলো পড়েনি এমন গভীরে আজও সময় থমকে আছে। এই গুহার প্রতিটি স্তরে প্রাচীন চুনাপাথরের স্তর রয়েছে। সেখানে সমুদ্রের জীবাশ্মগুলি হাজার হাজার বছর ধরে অচল অবস্থায় ছিল। সম্প্রতি এই গুহায় খনন ও গবেষণার সময় এমন দুটি হাঙর প্রজাতির জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যারা তখনকার সমুদ্রের ‘শীর্ষ শিকারি’ ছিল। গবেষকরা এগুলিকে চিহ্নিত করেছেন ‘ট্রোগ্লোক্লাডোডাস ট্রিম্বলি’ এবং ‘গ্লিকম্যানিয়াস কেয়ারফোরাম’ নামে। এরা এক প্রাচীন ‘সেটেনাক্যান্থ হাঙর’ নামক গোষ্ঠীর অন্তভুর্ক্ত। প্রায় ১০-১২ ফুট (৩-৩.৬ মিটার) লম্বা। যা আজকের ‘সামুদ্রিক হোয়াইটটিপ হাঙর’-এর সমান ।হাঙরের তরুণাস্থি দেহাবশেষ প্রায়শই ভঙ্গুর এবং ক্ষয়ের ফলে সহজেই ধ্বংস হয়ে যায়, তাই সুরক্ষিত স্থানে তাদের সংরক্ষিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া বিশেষভাবে ফলপ্রসূ। ‘ট্রোগ্লোক্লাডোডাস ট্রিম্বলি’-এর দাঁতের কাঠামো থেকে বোঝা যায় এটি দ্রুত শিকারে দক্ষ। প্রাণীপূর্ণ সমুদ্রের মাঝখানে সহজেই শিকার ধরত। ‘গ্লিকম্যানিয়াস কেয়ারফোরাম’-এর খন্ডিত দাঁতের হাড় ও কার্টিলেজ আজও সংরক্ষিত আছে। হাঙরগুলি প্রায় কার্বোনিফেরাস যুগে বাস করত। ডাইনোসর আসার কোটি কোটি বছর আগেই। এ সময় ছিল এক প্রাগৈতিহাসিক উষ্ণ, সমতল ও গভীর সমুদ্র, যেখানে হাড়যুক্ত মাছ, খোলসযুক্ত প্রাণী ও প্রাণঘাতী শিকারিদের ত্রাস ছিল। ম্যামথ গুহা কোনো সাধারণ গুহা নয়। এর ভিতরে যত দূরই অনুসন্ধান করা হয়েছে, ৭০+ ধরণের মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। প্রমাণ হয়, এই অঞ্চলের অনেক উপরিস্তর একসময় শুষ্ক ভূমির নীচে সমুদ্র ছিল। গুহার অভ্যন্তরে কয়েক দশক ধরে গবেষক, স্বেচ্ছাসেবক ও ভূতাত্ত্বিকরা প্রচুর সময় ব্যয় করে কুঁড়েঘরে থেকে সংকীর্ণ পথ ধরে জীবাশ্ম সংগ্রহ করেছেন। তাজা দাঁত, চোয়ালের বিচ্ছিন্ন অংশ ও কার্টিলেজ পাওয়া গেছে, যা আমাদের প্রাণীটির খাদ্যাভ্যাস, দেহের কাঠামো ও পরিমণ্ডলের পরিবর্তন সম্পর্কে গভীর তথ্য দেয়। এই আবিষ্কারের ফলে দুটি বড় জিনিস স্পষ্ট হয়েছে। যথা-

১. হাঙর ও অন্যান্য সামুদ্রিক জীবের বিবর্তন কেমন করে ঘটেছে সেই প্রশ্নে নতুন প্রমাণের ভান্ডার পাওয়া গেছে।

২. সমুদ্রগুলি কবে কোথায় উঠছে-নামছে, ভূখণ্ড কিভাবে ভাঙছে ও গঠিত হচ্ছে, এই দীর্ঘ সময়ের গঠন পরিবর্তনগুলিকে সহজ ভাষায় খুঁটিয়ে দেখা যাচ্ছে। শুধু হাঙর জীবাশ্মই নয়, এ ধরনের আবিষ্কার আমাদের প্রাচীন পৃথিবীর ‘এক্সক্লুসিভ টাইম ক্যাপসুল’-এর দরজা খুলে দেয়। এটি প্রাণীর শারীরিক কাঠামো, খাদ্যচক্র, পরিবেশ ও পরিবেশগত চাপের তথ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে। এ ছাড়াও গুহার ‘স্থিতিশীল তাপমাত্রা’ ও ‘সুরক্ষিত অবস্থার’ কারণে এমন ভঙ্গুর জীবাশ্ম আজও প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। এটি পুরাতত্ত্ববিদদের কাছে এক অতুলনীয় অভিজ্ঞতা।

 

সুত্র: New ctenacanth sharks (Chondrichthyes; Elasmobranchii; Ctenacanthiformes) from the Middle to Late Mississippian of Kentucky and Alabama Journal of Vertebrate Palaeontology.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − three =