প্রায়-মানুষ চৈনিক রোবট   

প্রায়-মানুষ চৈনিক রোবট   

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

চীনের সাংহাইয়ে উন্মোচিত হয়েছে বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মানবসদৃশ জৈব অনুকরণমূলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট “মোয়া”। এই রোবটটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হল ড্রয়েডআপ। মোয়ার হাত ধরে প্রযুক্তির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। সেখানে একটি রোবটের কেবল যন্ত্র সত্তা থাকছে না, আবার সে পুরোপুরি মানুষও হয়ে উঠছে না। ড্রয়েডআপের দাবি মোয়া কেবল দেখতেই মানুষের মতো নয়, সে মানুষের মতোই হাঁটে, চোখে চোখ রেখে তাকায় এবং সূক্ষ্ম মুখভঙ্গি প্রকাশ করতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই মোয়াকে প্রচলিত শিল্প-রোবট বা কার্টুনধর্মী ডিজাইন থেকে আলাদা করেছে।

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোই মোয়াকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। সেখানে দেখা যায়, রোবটটি মানুষের মতো সুষম ভঙ্গিতে হাঁটছে, চোখে চোখ রেখে তাকাচ্ছে, মাথা নাড়ছে এবং মুহূর্তভেদে সূক্ষ্ম মুখভঙ্গির মাধ্যমে আবেগের আভাস দিচ্ছে। মুখভঙ্গির এই অনুকরণ ক্ষমতাই মোয়াকে প্রচলিত মানবসদৃশ রোবটের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে। ড্রয়েডআপের মতে এটি এমন এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা নিছক নির্দেশ পালন করে না, নিজের শরীরের মাধ্যমেই পরিবেশকে উপলব্ধি করে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানায়।

মোয়ার শারীরিক গঠন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছাকাছি। এর উচ্চতা প্রায় ১.৬৫ মিটার এবং ওজন প্রায় ৩২ কেজি রাখা হয়েছে। এমনকি এর দেহের তাপমাত্রাও ৩২ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে, যাতে একজন সত্যিকারের মানুষের মতো উষ্ণ স্পর্শ অনুভূত হয়। ড্রয়েডআপের দাবি, মোয়ার হাঁটাচলার ভঙ্গির যথার্থতা প্রায় ৯২ শতাংশ। এই নির্ভুলতা শুধুমাত্রই প্রযুক্তিগত কৃতিত্ব নয়, রোবটের মানবসদৃশ চলাচলের ক্ষেত্রে এ উদ্ভাবন নিঃসন্দেহে এক বিরাট অগ্রগতি।

তবে এই বাস্তবতাই সকলের কাছে সমান স্বস্তিকর নয়। চীনা সামাজিক মাধ্যমে মোয়ার মানবসদৃশ আচরণকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া দ্বিধাবিভক্ত। একদল একে ভবিষ্যতের সঙ্গী হিসেবে দেখছেন। অন্যদল প্রযুক্তিটির পরিশীলন দেখে মুগ্ধ হলেও, এর চলাফেরাকে অস্বস্তিকর বলে বর্ণনা করছেন। এই প্রতিক্রিয়াকে মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় বলা হয় ‘আনক্যানি ভ্যালি’। অর্থাৎ, যেখানে কোনো কৃত্রিম সত্তা মানুষের খুব কাছাকাছি পৌঁছালেও সম্পূর্ণ মানুষ না হওয়ায় অজানা অস্বস্তি জন্ম নেয়।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে ড্রয়েডআপ খুব বেশি তথ্য প্রকাশ না করলেও, প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণকারী রোবোহরাইজনের তথ্যমতে মোয়া একটি মডিউলার ‘ওয়াকার 3’ কাঠামোর আদলে নির্মিত। ফলে ভেতরের কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে এর বাহ্যিক রূপ বদলানো সম্ভব। তবে এই নাম নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে, কারণ ‘ওয়াকার’ নামটি অন্য এক রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউবিটেকের সঙ্গেও জড়িত।

ড্রয়েডআপ মোয়াকে ঘরোয়া সহকারী বা শিল্পকারখানার রোবটের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। বরং তাকে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও বাণিজ্যিক পরিসরে মানুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগের সঙ্গী হিসেবে কল্পনা করছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ১২ লাখ ইউয়ান মূল্যে মোয়া বাজারে আসতে পারে। সব মিলিয়ে, মোয়া শুধু একটি ব্যতিক্রমী রোবটের আত্মপ্রকাশ নয়। এটি আমাদের সামনে একটি মূল্যবান প্রশ্ন ছুড়ে দেয়: প্রযুক্তি যদি কোনোদিন হুবহু মানুষের মতো আচরণ শিখে নেয়, সেক্ষেত্রে মানুষ কি তাকে আপন করে নিতে প্রস্তুত?

 

সূত্র: World’s first ‘biomimetic AI robot’ Moya debuts with 92% human-like walking accuracy ByKaif Shaikh, Interesting Engneering, 5th February 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 + three =