প্লাস্টিকের সুপরিকল্পিত বিনাশ 

প্লাস্টিকের সুপরিকল্পিত বিনাশ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ জানুয়ারী, ২০২৬

প্লাস্টিক দূষণ আজ আধুনিক সভ্যতার অন্যতম পরিচিত পরিবেশগত সংকট। প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টিক বোতল, ব্যাগ ও মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু দৃশ্যদূষণ নয়, বাস্তুতন্ত্র ও মানবস্বাস্থ্যের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি বিপদ। এই প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্কের বেয়ার মাউন্টেন স্টেট পার্কে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক বোতলের দৃশ্য রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ ইউওয়েই গু-এর মনে এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রকৃতিতে ডিএনএ, আরএনএ, প্রোটিন ও সেলুলোজ প্রভৃতি পলিমার থাকলেও সেগুলো চিরকাল জমে থাকে না, অথচ কৃত্রিম প্লাস্টিক কেন শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকে? এর কারণ কি হতে পারে? উত্তরটি তিনি খুঁজে পান রসায়নের সূক্ষ্ম গঠনে।

প্রকৃতির পলিমারগুলো শুধু কাজ করতেই জানে না, জানে কখন সরে যেতে হবে। তাদের রাসায়নিক গঠনের মধ্যেই থাকে ভাঙনের সংকেত—এক ধরনের প্রাকৃতিক সময় সংকেত। এই ধারণা থেকেই গু ও তাঁর সহকর্মীরা প্লাস্টিকের জন্য এক অভিনব সমাধান হাজির করেছেন। এটি ব্যবহারকালে শক্ত ও টেকসই থাকবে, কিন্তু পরে প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে মিশে যাবে। এই ধারণাটি সম্প্রতি নেচার কেমিস্ট্রিতে প্রকাশিত হয়েছে।

এই নতুন প্রজন্মের প্লাস্টিক বাহ্যত আমাদের পরিচিত শক্ত ও টেকসই প্লাস্টিকের মতোই। কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে আছে সূক্ষ্ম দুর্বলতা—ঠিক যেন কাগজ ভাঁজ করলে যেখানে ছিঁড়ে যায়, সেই দাগ। পলিমারের অণুগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট সংকেত পেলে বন্ধনগুলো দ্রুত আলগা হয়ে যাবে। আশ্চর্যের বিষয়, এই ভাঙনের জন্য প্রয়োজন নেই অতিরিক্ত তাপ বা ক্ষতিকর রাসায়নিকের; স্বাভাবিক পরিবেশেই প্রক্রিয়াটি শুরু হতে পারে।

সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হলো—এই ভাঙন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য । বিজ্ঞানীরা চাইলে এমন প্লাস্টিক বানাতে পারেন যা একদিনে ভেঙে যাবে, আবার চাইলে এমনও বানাতে পারবে যা দশ বছর পর্যন্ত অটুট থাকবে। অর্থাৎ, প্লাস্টিকের আয়ু তার ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়।

অতিবেগুনি আলো বা সাধারণ ধাতব আয়ন ব্যবহার করে প্রয়োজনমতো এই অবক্ষয়কে সক্রিয় করাও সম্ভব। ফলে খাবারের মোড়ক থেকে শুরু করে গাড়ির যন্ত্রাংশ—প্রতিটি ব্যবহারের জন্য আলাদা জীবনকাল নির্ধারণ করা যায়।

এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা শুধু পরিবেশ রক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়। সময়নির্ধারিত ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যাওয়া আবরণ, কিংবা চিকিৎসা উপকরণ প্রভৃতি ক্ষেত্রেও এটি বিপ্লব ঘটাতে পারে। প্রাথমিক পরীক্ষায় ভাঙনের ফলে উৎপন্ন তরলকে বিষাক্ত মনে হয়নি, যদিও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা যাচাই এখনো চলছে।

পথে হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতি থেকে ধার করা একটি সহজ ধারণা যে প্লাস্টিক সমস্যার এমন গভীর সমাধান দিতে পারে—এই গবেষণা তা প্রমাণ করেছে। কাজের শেষে প্লাস্টিকের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া হয়তো আর কল্পনা নয়, বরং ভবিষ্যতের বাস্তবতা।

 

সূত্র: Conformational preorganization of neighbouring groups modulates and expedites polymer self-deconstruction. Nature Chemistry, 2025; DOI: 10.1038/s41557-025-02007-3

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

11 + sixteen =