‘ফিল্ডস পদক’-এর দাবিদার ওয়াং হং

‘ফিল্ডস পদক’-এর দাবিদার ওয়াং হং

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৯ মার্চ, ২০২৬

চীনের তরুণী গণিতবিদ ওয়াং হং। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি ‘কাকেয়া কনজেকচার’ নামক এমন এক সমস্যার সমাধান করেছেন যা প্রায় শতাব্দী ধরে গণিতবিদদের ধাঁধায় ফেলেছিল। আর এই কাজই এখন তাকে ২০২৬ সালের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গণিত পুরস্কার ‘ফিল্ডস পদক’ লাভের এক প্রধান দাবিদার করে তুলেছে। কাকেয়া সমস্যাটি মূলত জ্যামিতিক পরিমাপতত্ত্বের এক জটিল প্রশ্ন। খুব সরলভাবে বললে, প্রশ্নটি হল: একটি সূচ বা রেখাংশকে সব দিক দিয়ে ঘোরানোর জন্য ক্ষুদ্রতম পরিসর কতটা হতে পারে? শুনতে বাচ্চাদের জ্যামিতির ধাঁধার মতন। কিন্তু ত্রিমাত্রিক জগতে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গণিতবিদরা প্রায় একশো বছর ধরে হোঁচট খাচ্ছিলেন। ওয়াং হং সেই বন্ধ দরজাটিই খুলে দিয়েছেন। তার সমাধান শুধু একটি তাত্ত্বিক সাফল্য নয়, বিশেষজ্ঞদের মতে এটি ইমেজিং, ডেটা প্রসেসিং, ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তি- সব ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে একই দিনে ওয়াং হং দুটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পান। প্রথমটি সালেম পুরস্কার। এটি তিনি ভাগ করে নেন বুলগেরীয় গণিতবিদ ভেসেলিন দিমিত্রভ- এর সঙ্গে। এই পুরস্কার দেয় প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি। তখন তাকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ টেরেন্স টাও, যাকে প্রায়ই “গণিতের মোৎসার্ট’’ বলা হয়। কিন্তু বিস্ময় এখানেই শেষ নয়। ঠিক একই দিনে ওয়াং হং আরেকটি সম্মান পান। আইসিসিএম গণিতের স্বর্ণ পুরস্কার। আর এই পুরস্কার তিনি সহকর্মী দেং ইউ- এর সাথে ভাগ করে নেন। সঙ্গে ছিল আরেক দাবীদার ইউয়ান শিনই। এই সব সাফল্যের পর এখন অনেকেই মনে করছেন, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক গণিত কংগ্রেসে ঘোষিত হতে যাওয়া ফিল্ডস পদকের সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকায় ওয়াং হং অন্যতম।

এই পুরস্কার প্রতি চার বছর অন্তর, সাধারণত অনূর্ধ্ব-৪০ গণিতবিদদের অসামান্য অবদানের জন্য দেওয়া হয়। ইতিহাস বলছে, সালেম পুরস্কার অনেক সময় ভবিষ্যতের ফিল্ডস পদক বিজয়ীদের পূর্বাভাস দেয়। ১৯৬৮ সাল থেকে সালেম পুরস্কার পাওয়া ৫৬ জনের মধ্যে ১০ জন পরে ফিল্ডস পদক জিতেছেন। যাদের মধ্যে টেরেন্স টাওও আছেন। যদি ওয়াং হং এই পুরস্কার পান, তবে তিনি হবেন, এই পুরস্কার বিজয়িনী প্রথম চীনা নারী গণিতবিদ। ওয়াং হংয়ের কাহিনীর শুরু দক্ষিণ চীনের গুইলিন শহরে। বাবা-মা দুজনেই ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে ছিল অদ্ভুত এক মেধার ঝলক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই তিনি প্রথম শ্রেণির পড়া শেষ করে ফেলে সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। তিনি প্রায়ই নিজের মতো করে পড়াশোনা করতেন। লাইব্রেরি থেকে বই খুঁজে এনে কঠিন সমস্যা সমাধান করতেন। তারপর সহপাঠী বা শিক্ষকদের সঙ্গে সেই বিষয়ে আলোচনা করতেন। অনেক বিখ্যাত গণিতবিদের মতো তিনি কিন্তু গণিত প্রতিযোগিতা বা অলিম্পিয়াডের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ পাননি। বরং তার প্রধান শিক্ষক ছিল লাইব্রেরির বই এবং নিজস্ব কৌতূহল। চীনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা পাস করার পর তিনি প্রথমে ভূবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু পরে বুঝতে পারেন তার প্রকৃত ভালোবাসা গণিতেই। ২০১১ সালে স্নাতক হওয়ার পর তিনি ফ্রান্সে যান। সেখানে একোল পলিটেকনিক- এ পড়াশোনা করে পরে প্যারিস-সুদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এ ২০১৯ সালে পিএইচ ডি সম্পন্ন করেন। তার গবেষণা-নির্দেশক ছিলেন গণিতবিদ লারি গুথ। পি এইচ ডির পর তিনি আবার প্রিন্সটনের এ পোস্টডক গবেষণা করেন। ২০২১ সালে তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেস- এ । ২০২৩ সালে হং চলে আসেন কুরাঁ ইনস্টিটিউট অব ম্যাথেমেটিক্যাল সায়েন্সেস- এ। ২০২৫ সালের মধ্যেই তিনি পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক হয়ে ওঠেন, যা এক অসাধারণ দ্রুত অগ্রগতি। একই সঙ্গে তিনি ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট অব ফায়ার সায়েন্টিফিক স্টাডিজ-এ স্থায়ী অধ্যাপক পদও পান। সেখানে ‘প্রথম নারী’ হিসেবে স্থায়ী নিয়োগ লাভ করেন। এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসও আশ্চর্য। এখানকার ১৩ জন স্থায়ী গণিত অধ্যাপকের মধ্যে ৮ জন ফিল্ডস পদক জিতেছেন।

ওয়াং হংয়ের কাহিনী শুধু একটি গণিত সমস্যার সমাধান নয়। এ কাহিনী কৌতূহল, একাকী অধ্যয়ন এবং ধৈর্যের। একটি ছোট শহরের মেয়ের লাইব্রেরির বই থেকে শুরু হওয়া যাত্রা আজ পৌঁছে যাচ্ছে গণিতের সর্বোচ্চ মঞ্চে। এখন বিশ্ব অপেক্ষা করছে জুলাই, ২০২৬-এর জন্য। কারণ তখন হয়তো ইতিহাস লেখা হবে, আর গণিতের জগৎ পাবে তার তৃতীয় নারী ফিল্ডস পদক বিজয়ীকে।

 

সূত্র: Institut des Hautes Études Scientifiques Research institute

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × five =