বর্ষারণ্যের চাই আরো নাইট্রোজেন  

বর্ষারণ্যের চাই আরো নাইট্রোজেন  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ জানুয়ারী, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখে ক্রান্তীয় বর্ষা অরণ্য। “পৃথিবীর ফুসফুস” বলা হয় এই ক্রান্তীয় বর্ষা অরণ্যকে। বিশাল সবুজ এই বন শুধু সৌন্দর্যের আধার নয়, এরা বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে নিয়ে নিজেদের কাঠ ও কাণ্ডে আটকে রাখে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির গতি কিছুটা হলেও কমে। বিশেষ করে তরুণ বর্ষাবন দ্রুত বেড়ে ওঠে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা শক্তিশালী একদল নবীন যোদ্ধা।

আজ পৃথিবীর বহু উষ্ণমণ্ডলীয় এলাকায় এমন তরুণ বন গড়ে উঠছে, যেখানে একসময় চাষবাস, গবাদি পশু চরানো হত, কাঠ কাটা বা আগুনে পোড়া জমি ছিল। এই বনগুলো দ্রুত বড় হলে দ্রুত কার্বন ধরে রাখতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই প্রাথমিক পুনরুদ্ধার পর্বে এমন কোন উপাদান আছে যারা এদের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে? নতুন গবেষণা জানাচ্ছে, সেই চাবিকাঠির নাম হল নাইট্রোজেন।

গাছের বেড়ে ওঠার জন্য যেমন- আলো ও জল দরকার, তেমনি দরকার মাটির পুষ্টি। নাইট্রোজেন গাছের পাতার সবুজ রং, সালোকসংশ্লেষণ আর শক্তি উৎপাদনের মূল সহায়। কিন্তু জমি পরিষ্কার হওয়ার পর মাটি প্রায়ই নাইট্রোজেন হারায়। হয় বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়,নতুবা গ্যাস হয়ে উড়ে যায় আকাশে। ফলে পর্যাপ্ত সূর্যালোক আর জল থাকা সত্ত্বেও গাছ যেন শক্তি হারিয়ে ফেলে, আর কার্বন ধরার কাজ ধীর হয়ে পড়ে। নাইট্রোজেনের সীমাবদ্ধতা তরুণ গ্রীষ্মমন্ডলীয় বনগুলিকে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর 470 থেকে 840 মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন ডাই অক্সাইড সংরক্ষণে বাধা দিতে পারে। এই পরিমাণটি প্রায় 140 মিলিয়নেরও বেশি পেট্রল চালিত গাড়ি থেকে নির্গমনের সমান।

এই ধারণার সত্যতা যাচাই করতে পানামায় বিভিন্ন বয়সের বনভূমিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি এক বৃহৎ পরীক্ষামূলক গবেষণা চালানো হয়। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ছিল ৭৬টি বড় বনাঞ্চল। কোথাও সদ্য পরিত্যক্ত পশুচারণভূমি, কোথাও ১০ বছরের বন, কোথাও ৩০ বছরের, আবার কোথাও শতাব্দীপ্রাচীন অরণ্য। কিছু জায়গায় মাটিতে নাইট্রোজেন যোগ করা হয়, কিছুতে ফসফরাস, কিছুতে দুটোই, আর কিছু জায়গায় কিছুই নয়।

দেখা গেছে, খুব অল্পবয়সী বনগুলোতে নাইট্রোজেনের অভাব গাছের বৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছিল। নাইট্রোজেন যোগ করার ফলে সদ্য পরিত্যক্ত চারণভূমিতে গাছের বৃদ্ধি প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং ১০ বছর বয়সী বনে বেড়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। এর ফলে গাছের কাণ্ড ও ডাল দ্রুত বেড়েছে, বেশি কার্বন সঞ্চিত হয়েছে।

তবে ৩০ বছরের বেশি পুরোনো বনগুলো নাইট্রোজেন যোগের পর তেমন সাড়া দেয়নি। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু বিশেষ গাছ ও ব্যাকটেরিয়া নিজেরাই বাতাস থেকে নাইট্রোজেন এনে মাটিতে যোগ করে দেয়।

আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই গবেষণায় ফসফরাসকে কোনো পর্যায়েই বড় সীমা আরোপকারী উপাদান হিসেবে পাওয়া যায়নি। ফলে দীর্ঘদিনের প্রচলিত এক ধারণা বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উষ্ণমণ্ডলীয় বনভূমিতে ফসফরাসের অভাবকেই প্রধান বাধা হিসেবে দেখা হতো। এবার প্রমাণ হয়ে গেল সেটা সত্য নয়। এই ধরনের গাছেরা মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা ফসফরাস বের করে আনার কৌশল রপ্ত করে ফেলেছে।

গবেষণাটি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হল যে, তরুণ ক্রান্তীয় বর্ষারণ্যের প্রাথমিক পুনরুদ্ধার পর্যায়ে নাইট্রোজেনের সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে কার্বন ধারণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। যদিও কৃত্রিম সার প্রয়োগ পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করে, তবু সঠিক প্রজাতি নির্বাচন ও বন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রাকৃতিক নাইট্রোজেন চক্রকে সক্রিয় করা যেতে পারে। তরুণ বর্ষাবনকে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করলে তারাই প্রথম দশ বছরে পৃথিবীর জন্য অমূল্য সময় উপহার দিতে পারে। যদিও বন একা জলবায়ু সংকটের সমাধান নয়, তবু এই সবুজ যোদ্ধাদের দ্রুত শক্তিশালী করা গেলে, মানবসভ্যতার হাতে হয়তো কিছুটা কার্বনমুক্ত সময় আসবে।

 

সূত্র: Tropical forest carbon sequestration accelerated by nitrogen by Wenguang Tang, Jefferson S. Hall,et.al; published in the journal Nature Communications, Article number: 55 (2026), 13th January 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × two =