বাঁশের কুঁড়ির পুষ্টিগুণ

বাঁশের কুঁড়ির পুষ্টিগুণ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬

বাঁশকে আমরা শুধু দ্রুত বেড়ে ওঠা একটি উদ্ভিদ কিংবা দৈনন্দিন নির্মাণসামগ্রীর উৎস হিসেবেই চিনতাম। এবার সে আলোচনায় এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা বলছে, বাঁশের কচি অঙ্কুর বা বাঁশকুঁড়ি নাকি এক প্রবল সম্ভাবনাময় খাদ্য, যা আধুনিক বিশ্বের বহু স্বাস্থ্যসমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইংল্যান্ডের অ্যাংলিয়া রাস্কিন বিশ্ববিদ্যালয়–এর গবেষকদের করা এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক রিভিউতে বাঁশের খাদ্যগুণ ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতার বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। এই গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, নিয়মিত বাঁশকুঁড়ি খাওয়া রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে, যা ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এটি প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে—যা কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। কিছু মানব পরীক্ষায় রক্তে চর্বির মাত্রা বা লিপিড প্রোফাইলের উন্নতিও লক্ষ্য করা গেছে, যা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।

বাঁশকুঁড়ির অন্যতম শক্তি তার পুষ্টিগত গঠনে। বাশকুঁড়ি প্রাকৃতিকভাবে কম চর্বিযুক্ত হলেও এতে রয়েছে ভালো মানের প্রোটিন ও মাঝারি মাত্রার খাদ্যআঁশ। এতে সেলেনিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, পাশাপাশি থায়ামিন, নিয়াসিন, ভিটামিন A, B6 ও E–এর মতো একাধিক ভিটামিন উপস্থিত। এই পুষ্টিগুণই বাঁশকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য উপাদানে পরিণত করেছে।

এছাড়াও বাঁশে থাকা বিভিন্ন ধরনের আঁশ, যেমন- সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ ও লিগনিন—হজম প্রক্রিয়া উন্নত করতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁশকুঁড়ি অন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। পরীক্ষাগারে করা গবেষণায় বাঁশের প্রোবায়োটিক প্রভাবও শনাক্ত হয়েছে, যা সামগ্রিক অন্ত্রস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক।

এছাড়া গবেষকরা দেখেছেন, বাঁশে থাকা কিছু যৌগ রান্নার সময় তৈরি হওয়া ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ—যেমন অ্যাক্রিলামাইড ও ফুরান—এর পরিমাণ কমাতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে বাঁশ খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধির একটি কার্যকর উপাদান হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই সব সম্ভাবনার পাশাপাশি গবেষকরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। কিছু প্রজাতির বাঁশে প্রাকৃতিকভাবে সায়ানোজেনিক গ্লাইকোসাইড থাকে, যা কাঁচা বা ঠিকমতো রান্না না করলে সায়ানাইড তৈরি করতে পারে। এই বাঁশে থাকা প্রাকৃতিক বিষাক্ত উপাদান সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এছাড়া কিছু উপাদান থাইরক্সিন হরমোনের কাজে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এসব ঝুঁকি এড়াতে বাঁশকুঁড়ি ভালভাবে সেদ্ধ করে খাওয়া আবশ্যিক।

গবেষকদের মতে, বাঁশের সুপারফুড হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট হলেও মানবভিত্তিক গবেষণা এখনো সীমিত। ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত গবেষণাই নির্ধারণ করবে এই দ্রুত বেড়ে ওঠা উদ্ভিদটি বিশ্বব্যাপী খাদ্যতালিকায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারবে।

 

সূত্রঃ Bamboo consumption and health outcomes: A systematic review and call to action by Damiano Pizzol, Tobia Zampieri,et.al; Materials provided by Anglia Ruskin University, published in Advances in Bamboo Science, 2025; 13: 100210 DOI: 10.1016/j.bamboo.2025.100210

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 5 =