
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন একটি নতুন উপায় খুঁজে পেয়েছেন যাতে বিষাক্ত কোনো রাসায়নিক বা ক্ষতিকর দ্রাবক ব্যবহার না করেও প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা যাবে।এই পদ্ধতিতে বাতাসে থাকা স্বাভাবিক আর্দ্রতা ব্যবহার করে প্লাস্টিক ভাঙতে সাহায্য করে। তাঁরা পলিথিন টেরেফথ্যালেট(পি ই টি) নামের এক ধরনের প্লাস্টিক ভাঙতে কম খরচের একটি বিশেষ ধরণের রাসায়নিক অনুঘটক ব্যবহার করেছেন। পিইটি প্লাস্টিক মূলত বোতল, কাপড়, প্যাকেট ইত্যাদিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।এই নতুন পদ্ধতিতে, প্লাস্টিক ছোট ছোট অংশে ভেঙে গেলে সাধারণ বাতাসের সংস্পর্শে এসে মনোমার (প্লাস্টিক তৈরির ক্ষুদ্র উপাদান) তৈরি করে। এরপর এই মনোমারগুলো থেকে নতুন প্লাস্টিক বা আরও মূল্যবান জিনিস তৈরি করা সম্ভব।এই গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে এই পদ্ধতি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের জন্য সহজ, কম খরচের এবং পরিবেশবান্ধব উপায় হতে পারে।গবেষক ইয়োসি ক্র্যাতিশ-এর মতে
মাথাপিছু প্লাস্টিক দূষণকারী দেশগুলির মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম সারিতে, কিন্তু সেই প্লাস্টিকের মাত্র ৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়।গবেষক ক্র্যাতিশ বলছেন, এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো,বিজ্ঞানীরা নির্ভুলভাবে বাতাসের আর্দ্রতা ব্যবহার করে প্লাস্টিকগুলিকে ভেঙেছেন।তাঁর মতে প্লাস্টিকের মূল উপাদান অর্থাৎ মনোমারগুলি সংগ্রহ করে তা থেকে আবার নতুন প্লাস্টিক বানানো যাবে বা আরও দামি জিনিস তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে।গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক নবীন মালিক বলেন, এই গবেষণা পরিবেশের প্লাস্টিক ও বর্জ্যের সমস্যা সমাধানের একটি সহজ ও টেকসই উপায় বার করেছে ।তাঁর মতে সাধারণ পুনর্ব্যবহারীকরণ
পদ্ধতিতে অনেক শক্তি ও রাসায়নিক ব্যবহৃত হওয়ায় লবনের মতো ক্ষতিকর বর্জ্য তৈরি হয়। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের পরিবর্তে শুধু বাতাসে থাকা সামান্য আর্দ্রতা ব্যবহার করা হয়। এতে পরিবেশবান্ধব হওয়ার পাশাপাশি এটিকে বাস্তব জীবনেও সহজে ব্যবহার করা সম্ভব ।খাদ্যের মোড়ক এবং পানীয়ের বোতলের মতো জিনিসপত্রে সাধারণত ব্যবহৃত পিইটি প্লাস্টিক বিশ্বব্যাপী মোট প্লাস্টিকের প্রায় ১২ শতাংশ।
এই প্লাস্টিক সহজে নষ্ট হয় না। ফলে আবর্জনার স্তূপে জমে থেকে ছোট ছোট টুকরো হয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়, যা জলের উৎসে মিশে গিয়ে পরিবেশে দীর্ঘদিন থেকে যায়।প্রচলিত পুর্নব্যবহারীকরণ পদ্ধতিগুলোতে বেশ কিছু সমস্যা থাকায় বিজ্ঞানীরা প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার নতুন উপায় খুঁজছেন।প্রচলিত প্রক্রিয়াগুলোতে খুব বেশি তাপ, প্রচুর শক্তি এবং শক্তিশালী রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হওয়ায় ক্ষতিকর বর্জ্য তৈরি হয়। এছাড়া, পুর্নব্যবহারীকরণে ব্যবহৃত অনুঘটক অনেক সময়ই ব্যয়বহুল ও বিপজ্জনক, যা বর্জ্যের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। পুনর্ব্যবহার বিক্রিয়া
শেষ হওয়ার পর দরকারি উপাদানগুলি আলাদা করাও কঠিন। এতে খরচ ও জটিলতা বেড়ে যায়। আগের গবেষণায়,নর্থওয়েস্টার্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কস ও অন্যান্য বিজ্ঞানীরা মিলে এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন, যাতে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রাবক ব্যবহার না করেও প্লাস্টিক ভাঙা সম্ভব হয়েছিল। নতুন গবেষণায় তাঁরা আবারও একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, যা পরিবেশবান্ধব এবং সহজে বাস্তবায়নযোগ্য।ক্র্যাটিশ বলেন, দ্রাবক ব্যবহার করলে অনেক সমস্যা হয়। এগুলো দামি হওয়ায় গরম করতে অনেক শক্তি লাগে, আর প্রতিক্রিয়া শেষে অনেক মিশ্র উপাদান থেকে দরকারি অংশ আলাদা করা কঠিন।
তাই তাঁরা দ্রাবকের বদলে বাতাসের জলীয় বাষ্প ব্যবহার করেছেন । নতুন এই পদ্ধতি পরীক্ষা করতে, গবেষক দল পিইটি প্লাস্টিককে একটি সস্তা ও নিরাপদ অনুঘটক এবং সক্রিয় কার্বনের সাথে মিশিয়ে গরম করেন। এতে পিইটি-র বড় বড় অণুগুলো ভেঙে যেতে শুরু করে।এরপর, তাঁরা এই ভাঙা প্লাস্টিককে সামান্য পরিমাণ জলীয় বাষ্পযুক্ত বাতাসের সংস্পর্শে আনেন। এই জলীয় বাষ্প প্লাস্টিকের টুকরোগুলোকে টেরেফথ্যালিক অ্যাসিড নামে একটি দরকারি উপাদানে রূপান্তরিত করে, যা নতুন পলিয়েস্টার তৈরির কাজে লাগে।এই প্রক্রিয়ায় মাত্র একটি অতিরিক্ত পদার্থ তৈরি হয়, অ্যাসিট্যালডিহাইড, যাকে শিল্প পর্যায়ে সহজেই সরানো যায়।গবেষক মালিক বলেন, বাতাসে প্রাকৃতিক আর্দ্রতা থাকায় রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য তাকে সহজেই ব্যবহার করা যায় ।শুকনো আবহাওয়াতেও বাতাসে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ ঘন কিলোমিটার পরিমাণ জলীয় বাষ্প থাকে। এই জলীয় বাষ্প ব্যবহার করলে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রাবক লাগে না, এছাড়া কম শক্তি খরচ হয় এবং বিপজ্জনক রাসায়নিকের ব্যবহার এড়ানো যায়। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ, দুষণহীন ও পরিবেশবান্ধব ।পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই নতুন পদ্ধতিতে মাত্র চার ঘণ্টায় ৯৪ শতাংশ প্লাস্টিক পুনরুদ্ধার করা যায়। প্রক্রিয়াটি খুব দ্রুত ও কার্যকর। এছাড়া, ব্যবহৃত উপাদানগুলি অনেক শক্তিশালী এবং বারবার ব্যবহার করা যায়, তাই এটি বড় পরিসরে সহজেই কাজে লাগানো সম্ভব।এই পদ্ধতি শুধুমাত্র পলিয়েস্টার প্লাস্টিককেই ভাঙে, অন্য কোনো প্লাস্টিক বা মিশ্রিত উপাদান এর দ্বারা প্রভাবিত হয় না। প্লাস্টিক বোতল, পুরানো কাপড় এবং বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্যের ওপর পরীক্ষায় এটি দারুণভাবে কাজ করেছে। এমনকি, প্লাস্টিকের রঙও মুছে গিয়ে, পুনরুদ্ধার করা উপাদান একদম পরিষ্কার ও রংহীন হয়েছে।গবেষকরা এখন এই পদ্ধতিকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন, যাতে কারখানার প্লাস্টিক বর্জ্য সহজেই পুনর্ব্যবহার করা যায়।তাঁরা প্রতিক্রিয়ার সময়, অনুঘটকের পরিমাণ এবং তাপমাত্রা আরও উন্নত করে সাশ্রয়ী ও কার্যকর একটি উপায় বের করতে চান, যাতে পুরোনো প্লাস্টিককে নতুন পণ্য তৈরির উপাদানে পরিণত করা যায়। এটি প্রমাণ করে যে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বড় বড় সমস্যা সমাধান করতে পারি।