বিজ্ঞানে নারী

বিজ্ঞানে নারী

মানসী মিশ্র, স্নাতকোত্তর,বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়
Posted on ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫

১৯২৯ সালের পিক্টোরিয়াল রিভিউ বার্ষিক কৃতিত্ব পুরষ্কার গ্রহণের সময়, ফ্লোরেন্স রেনা সাবিন বলেছিলেন, “পুরুষ না মহিলা কার বুদ্ধি বেশি সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; মহিলাদের করণীয় হবে আমাদের যতটুকু বুদ্ধি আছে সেটার যথাযথ ব্যবহার করা ।”

ফ্লোরেন্স সাবিন হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিখ্যাত এনাটমি বিশেষজ্ঞ । ১৯২৫ সালে মার্কিন জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমিতে নির্বাচিত প্রথম মহিলা ।

সভ্যতার শুরু থেকে লিঙ্গগত বিভাজন কর্মের পরিধিকেও বেঁধে দিয়েছে। গতানুগতিক ধারণা অনুযায়ী নারীর কাজই হবে আশ্রয় খোঁজা, পোশাক বানানো,পশুপাখি এবং সন্তানের দেখভাল করা। কিন্তু প্রাচীন মিশরে মেরিট পাথের চিকিৎসা অনুশীলন করা থেকে শুরু করে চতুর্থ শতাব্দীতে আলেকজান্দ্রিয়ার হাইপেশিয়া প্রমুখ নারী বার বার এই ধারণায় ঘা দিয়েছেন।
হাইপেশিয়া (৩৭০-৪১৫খ্রী) একজন বিখ্যাত গণিতবিদ যিনি নিও প্লেটনিক দর্শনেও পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে খ্রিস্টান জনতার হাতে তিনি সহিংসভাবে নিহত হন। একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপের নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নারীদের বাদ দেয়া হলেও কনভেন্ট গুলি নারীদের বিদ্যার্জনের সুযোগ করে দিয়েছিল। এছাড়াও এসময় অনেক নারী বাড়িতে ভেষজ চিকিৎসাও শিখতেন।

আধুনিক যুগের শুরুর দিকে কেবলমাত্র উচ্চবিত্তরাই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেত। এরকম একজন নারী ছিলেন নিউক্যাসলের ডাচেস মার্গারেট ক্যাভেন্ডিশ। তিনি ১৬৬৭ সালে লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে যোগদান করেন। সেই সময় অধিকাংশ মহিলা লেখকই পুরুষ ছদ্ম নামের আড়ালে লিখত, তিনিই প্রথম নিজের নামে লেখালেখি শুরু করেন।
পরবর্তীতে ১৮ শতকের ‘এনলাইটমেন্ট'(জ্ঞান দীপ্তি ) বিজ্ঞানে নারীর জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
ইতালিতে লরা ব্যাসি প্রথম মহিলা যিনি এনাটমি এবং পরীক্ষাভিত্তিক দর্শনে অধ্যাপক নিযুক্ত হন। মারিয়া গেটানা অ্যাগনেসিক সাম্মানিক অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন ।ফ্রান্সে এমিলি দু শাতলে এবং সোফি জার্মেইন গণিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ক্যারোলিন হার্শেল তার ভাই, বিখ্যাত হার্শেলকে গবেষণার কাজে সহায়তা করতেন। এছাড়াও তিনি ধূমকেতু আবিষ্কার করেন এবং তারকা ক্যাটালগ সংশোধন করেছিলেন, যার ফলস্বরূপ রাজা তৃতীয় জর্জের কাছ থেকে বৃত্তি পান। স্কটিশ জ্যোতির্বিদ মেরি সোমারভিলও বৃত্তি পেয়েছিলেন। ১৮৩৫ সালে, দুজনকেই রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিকাল সোসাইটির সদস্য হিসেবেও সম্মানিত করা হয়েছিল।

এমন সময় নারীবাদের ঢেউ পশ্চিমা সমাজের সকল প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এরই সূত্র ধরে উনিশ শতকে, ইউরোপ এবং আমেরিকার নারীরা শিক্ষায় সাম্যর জন্য লড়াই করেন । ১৮৪৯ সালে এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েল প্রথম মহিলা যিনি চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। রাশিয়ান গণিতবিদ সোফিয়া কোভালেভস্কায়াকে রাশিয়ায় পড়াশোনা করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল । কিন্তু অদম্য সাহসের ওপর ভর করে তিনি জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা করেন। গণিতের ইতিহাসে তাঁর কাজ অবিস্মরণীয়।

উনিশ শতক এবং বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনে মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ায় গবেষণা ক্ষেত্রে মেয়েদের যাত্রা আরো একধাপ এগিয়ে যায়। কিছু মৌলিক কাজের সাথে সাথে অনেক মহিলা বিজ্ঞানী পুরুষ বিজ্ঞানীদের সহায়তাও করেন । উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলি হল, জ্যোতির্বিদ উইলিয়ামিনা প্যাটন স্টিভেন্স ফ্লেমিং এবং অ্যানি জাম্প ক্যানন। তিনি হার্ভার্ড কলেজ অবজারভেটারিতে আমেরিকান পদার্থবিদ এবং জ্যোর্তিবিদ এডওয়ার্ড পিকারিং এর জন্য তারার শ্রেণীবিভাগ করেন। অন্যদিকে রেবেকা সন্ডার্স এবং মুরিয়েল হোয়েলডেল আধুনিক জেনেটিক্স -এর বিকাশে সহায়তা করেন। কেমব্রিজে ল্যাবে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় তাঁরা মহিলাদের জন্য বালফুর জৈবিক পরীক্ষাগারে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
এমত অবস্থায় পুরুষ বিজ্ঞানীদের সহায়তাও নারীদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। মারি কুরি ও তার স্বামী পিয়ের ১৯০৩ সালে পদার্থবিদ্যায় যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯১১ সালে, তিনি একাই পোলোনিয়াম এবং রেডিয়াম আবিষ্কারের জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী যনি দুটি ভিন্ন ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার পান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নারীরা এমন অনেক ভূমিকা পালন করে যা আগে কেবলমাত্র পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। বৈজ্ঞানিক গবেষণাও তার অন্তর্ভুক্ত। ইসাবেলা কার্ল, ম্যানহাটন প্রকল্পে কাজ করার সময় প্লুটোনিয়াম অক্সাইড থেকে প্লুটোনিয়াম ক্লোরাইড বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। আমেরিকান গণিতবিদ গ্রেস মারেহপার মার্কিন নৌবাহিনীতে প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার ছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনেক নারী কর্মক্ষেত্র ছেড়ে চলে যান । কিন্তু জীববিজ্ঞানী র‍্যাচেল কারসন তার বৈজ্ঞানিক কর্মজীবন অব্যাহত রাখেন । নারীরা শারীরিক ও মানসিক ভাবে বৈজ্ঞানিক কাজের অযোগ্য, বিয়ের পর মেয়েদের আর কাজ করা উচিত নয়, এই সব ভ্রান্ত ধারণা এর ফলে ভেঙে যায়।
বিংশ শতাব্দীর নারী আন্দোলনের জোয়ার শিক্ষার সাথে কর্মস্থানে মেয়েদের সমান অধিকারের আওয়াজ তোলে । কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নারীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার সুযোগ করে দেয়। এই সামাজিক পরিবর্তন নারীদের পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং গণিতের সাথে সাথে আইন ও ব্যবসার মতো ক্ষেত্রগুলিতেও বিচরণ সহজ করে তোলে। তৎসত্ত্বেও কিন্তু বিজ্ঞান মহলে নারীদের স্বীকৃতি এসেছে অনেক পরে।
অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী লিস মেইটনার ইউরেনিয়াম পরমাণু বিভাজিত করে তার শক্তি গণনা করেছিলেন।কিন্তু এই আবিষ্কারের জন্য ১৯৪৪ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পান তার সহকর্মী অটো হান । মেইটনার এবং ফ্রিটজ স্ট্রাসম্যান পরে হানের সাথে ১৯৬৬ সালে এনরিকো ফের্মি পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন ডিএনএর গুরুত্বপূর্ণ এক্স-রে চিত্র তুলেছিলেন যা জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিককে ডি এন এ অণুর জোড়া হেলিক্স গঠন নির্ধারণে সাহায্য করে। কিন্তু ১৯৬২ সালে চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার আগেই তিনি মারা যান। ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ জোসেলিন বেল বার্নেল তাঁর উপদেষ্টা অ্যান্টনি হিউইশের সাথে কাজ করার সময় পালসার আবিষ্কার করেন। কিন্তু রেডিও টেলিস্কোপে কাজের জন্য ১৯৭৪ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার পান হিউইশ এবং স্যার মার্টিন রাইল।
এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রায় ৫০ শতাংশ ডক্টরেট ডিগ্রি মহিলাদের দেওয়া হতো। গণিত এবং ভৌতবিজ্ঞানে ডিগ্রীর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও কম্পিউটিং এবং প্রকৌশলবিদ্যার ক্ষেত্রে ছাত্রীদের সংখ্যা কমছিল।এই পরিসংখ্যানগত পরিবর্তনের কারণ হলো, উচ্চশিক্ষায় মহিলাদের অংশগ্রহণ এবং মহিলাদের পছন্দের ক্ষেত্র বেছে নিতে উৎসাহিত করা।

২০০১ সাল পর্যন্ত মাত্র ১০ জন নারী বিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নারী বিজ্ঞানীদের নোবেল পুরস্কার জয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রথম দশকের শেষ নাগাদ, ১৬ জন নারী বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন। যার মধ্যে ২০০৯ সালেই তিনজন। পরবর্তী বছরগুলিতে আরও বেশি নারীর নোবেল জয়ের সাথে সাথে এই ধারা অব্যাহত ছিল। নরওয়েজিয়ান স্নায়ুবিজ্ঞানী মে-ব্রিট মোসার (২০১৪) এবং চীনা বিজ্ঞানী এবং ফাইটোকেমিস্ট তু ইউইউ (২০১৫) চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল পান। ২০১৮ সালে, কানাডিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার বিজয়ী তৃতীয় মহিলা। রসায়নে নোবেল প্রাপক পঞ্চম মহিলা হিসেবে জায়গা করে নেন আমেরিকান রাসায়নিক প্রকৌশলী ফ্রান্সেস আর্নল্ড।
নানা আবিষ্কার ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে নারীদের অবদানের ব্যাপক স্বীকৃতি ভাবী গবেষকদের প্রেরণা দেবে। বিজ্ঞানের বিজয়রথকে তা আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 + 17 =