বিদ্বেষপূর্ণ সোশ্যাল মিডিয়া

বিদ্বেষপূর্ণ সোশ্যাল মিডিয়া

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ আগষ্ট, ২০২৫

২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স–এ রাজনৈতিক বিদ্বেষ এবং দলীয় বিভাজনের কারণে অসংখ্য ব্যবহারকারী একটি বিকল্প মাধ্যম খুঁজতে শুরু করেন। সেই প্রেক্ষাপটেই দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ব্লুস্কি। এ এক নতুন সামাজিক মাধ্যম, যেখানে কনটেন্ট সাজানোর জন্য কোনো অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়নি। তাই ধারণা ছিল, অ্যালগরিদম বাদ দিলে ঘৃণাত্মক ভাষা, ভুল তথ্য বা অতি-প্রচার কিছুটা হলেও কমে আসবে। প্রথমদিকে সেটি কার্যকরও মনে হয়েছিল। অনুসারীর সংখ্যার ভিত্তিতে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার কমে যায়। অপমানজনক ভাষা কম লক্ষ্য করা যায়। আর বিভ্রান্তিকর তথ্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই দেখা গেল, বিদ্বেষ বিভাজনের পুরোনো অসুখ আবার ফিরে এসেছে। অনেক ব্যবহারকারীর অভিযোগ, প্ল্যাটফর্মটি ধীরে ধীরে বামঘেঁষা রূপ নিয়েছে। এই বাস্তবতার পেছনে কারণ অনুসন্ধানে নতুন আলো দেখাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–ভিত্তিক সিমুলেশন। সম্প্রতি প্রকাশিত এক মুদ্রণ পূর্ব গবেষণা থেকে কিছু জিনিস বোঝা যাচ্ছে। কোনো জটিল অ্যালগরিদম বিহীন এই সামাজিক মাধ্যমের মৌলিক কাঠামোয় পোস্ট করা, রিপোস্ট করা এবং অন্যকে অনুসরণ করা- এগুলি নিজে থেকেই মেরুকরণের জন্ম দেয়। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞানী কেট স্টারবার্ড মন্তব্য করেছেন, এই ফলাফল অনলাইন সিস্টেম নিয়ে দীর্ঘদিনের বহু অনুমানের সঙ্গে মিলে যায়। সত্যিকারের অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে সামাজিক মাধ্যম সংক্রান্ত গবেষণা ব্যয়বহুল এবং নৈতিকভাবে জটিল। তাছাড়া, বড় সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর সহযোগিতা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইক লারোইজ এবং পিটার টর্নবার্গ ভিন্নপথ বেছে নেন। তাঁরা ব্যবহার করেন জেনারেটিভ সোশ্যাল সিমুলেশন। এখানে বৃহৎ ভাষা মডেল (LLM)–ভিত্তিক এআই, ব্যবহারকারীর ভূমিকা নেয়। লক্ষ্য ছিল সামাজিক মাধ্যমের তিনটি বড় সমস্যার মূল খুঁজে বের করা: ১. এমন কেন হল ? অর্থাৎ বামপন্থী ইকো চেম্বার –এর সৃষ্টি, ২. অল্প কিছু ব্যবহারকারীর হাতে প্রভাবের কেন্দ্রীভবন, ৩. চরমপন্থী মতামতের প্রচার- যা “সোশ্যাল মিডিয়া প্রিজম” নামে পরিচিত। তাঁরা তৈরি করেন ৫০০ এআই–ব্যবহারকারী। প্রতিটি ভার্চুয়াল প্রোফাইলে যুক্ত করা হয় বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম, রাজনৈতিক ঝোঁক ও শিক্ষার মাত্রা, যা নির্বাচনী বাস্তব সমীক্ষা থেকে নেওয়া। তিন দফা পরীক্ষায় তিনটি আলাদা মডেল ব্যবহার করা হয় – ChatGPT, Llama এবং DeepSeek । এই মডেলগুলো কৃত্রিম ব্যবহারকারীদের পছন্দ-অপছন্দ, পেশা, শখ ইত্যাদিতে বৈচিত্র্য আনে। প্রতিটি ধাপে একেকজন ব্যবহারকারী তিনটি সম্ভাব্য কাজের মধ্যে একটি বেছে নেয়: ২,১০,০০০ নিবন্ধের মধ্যে থেকে একটি বেছে নিয়ে পোস্ট করা, কোনো কনটেন্ট রিপোস্ট করা, অথবা অন্য ব্যবহারকারীকে অনুসরণ করা। তাদের ফিডে দেখা যেত ১০টি পোস্ট। অর্ধেক নিজের অনুসারী , অর্ধেক জনপ্রিয় কিন্তু অপরিচিত ব্যবহারকারীর কাছ থেকে নেওয়া। ১০,০০০ চক্র শেষে তিনটি পরীক্ষাতেই একই চিত্র ভেসে ওঠে। নেটওয়ার্ক ক্রমশ বিভক্ত হয়ে পড়ে, কিছু ব্যবহারকারী অতি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে এবং চরমপন্থী মত ছড়িয়ে পড়ে। গবেষক টর্নবার্গ বলেন,“আমরা ভেবেছিলাম জটিল নকশা তৈরি করতে হবে, কিন্তু দেখা গেল কেবল রিপোস্ট আর ফলো–এর মতো মৌলিক কাজই এক ধরনের বিষাক্ত নেটওয়ার্ক তৈরি করার পক্ষে যথেষ্ট।” এরপর গবেষকরা ছয় ধরনের হস্তক্ষেপ নিয়ে পরীক্ষা করেন। যেমন, পোস্ট শুধুই সময়ক্রম অনুযায়ী সাজানো, অথবা কম জনপ্রিয় পোস্ট সামনে আনা। এমনকি ভিন্ন রাজনৈতিক মতের কনটেন্ট জোর করে দেখানোর ব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু কোনোটিই পুরোপুরি কাজ করেনি। কিছু ক্ষেত্রে বরং বিদ্বেষ আরও বেড়ে যায়। টর্নবার্গ হতাশ হয়ে বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম এই গবেষণা আশাজনক কিছু দেবে, কিন্তু তা হয়নি।” স্টারবার্ড মনে করেন, মানুষের স্বভাব আর সামাজিক মাধ্যমের মনোযোগ–নির্ভর কাঠামো, এ দুটি একসঙ্গে মিলে এই সমস্যাকে অনিবার্য করে তুলছে। অন্যদিকে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানী ফিলিপ্পো মেনজার সতর্ক করে বলেছেন, বৃহৎ ভাষা মডেল নিজেই তো অনলাইন মানব আচরণের ওপর প্রশিক্ষিত। সেখানে বিভাজন ও বিষাক্ততা আগে থেকেই রয়েছে। ফলে সিমুলেশনের ফলাফল হয়তো শুরু থেকেই কড়া সংকেত দ্বারা নির্ধারিত। তবে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেনিফার অ্যালেন মনে করেন, সীমাবদ্ধতা থাকলেও এই গবেষণার গুরুত্ব রয়েছে। সহজ সমাধান নাও মিলতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে নিরপেক্ষ ও দ্বিদলীয় কনটেন্ট ভাগাভাগি করে মেরুকরণ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা বিবেচনা না করে আজকের রাজনীতি বোঝা প্রায় অসম্ভব । গবেষক স্টারবার্ডের কথায়, “অনলাইনে কীভাবে মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে তা না বুঝলে বর্তমান রাজনীতি বোঝাই যাবে না।”

তথ্যসূত্র : Don’t blame the algorithm: Polarization may be inherent in social media by Hannah Richter ; Science (Social Science News) (15th August, 2025)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four + ten =