
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। আজ থেকে একশো বছর আগে ১৯২৫এর ২১ মার্চ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি রাজ্যে আইন করে ডারউইন-ওয়ালেস-এর বিবর্তন তত্ত্ব পড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কারণ বিবর্তনবাদ বাইবেল-বিরোধী। বাইবেলে আছে মানুষ ঈশ্বরের নিজের হাতে তৈরি। টেনেসির দেখাদেখি আরও কিছু রাজ্যে বিবর্তনবাদ পড়ানো নিষিদ্ধ হল। তা সত্ত্বেও টেনেসির একটি সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে বায়োলজি ক্লাসে বিবর্তনবাদ পড়াতেন জন স্কোপ্স নামে চব্বিশ বছরের এক যুবক। একদিন তাঁর তলব পড়ল স্কুলের কর্তাদের কাছে। ‘ডারউইন তত্ত্বে কি এই কথা বলা আছে যে মানুষ আগে বাঁদর ছিল?’ – ‘না, ঠিক ওইভাবে নেই। তবে ডারউইন দেখিয়েছিলেন যে প্রাকৃতিক নির্বাচন নামক এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এক প্রাণি অন্য প্রাণিতে রূপান্তরিত হয়। সেইভাবেই একসময় স্তন্যপায়ী বনমানুষ জাতীয় প্রাণির উদ্ভব হয়, তারই বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অবশেষে হোমো সেপিয়েন্স বা আজকের মানবপ্রজাতির উদ্ভব।’ ‘কিন্তু বাইবেলে তো লেখা আছে: ‘তখন ঈশ্বর আপন সাদৃশ্যে মানুষ সৃষ্টি করলেন। ঐশ্বরিক সাদৃশ্যে নর ও নারীরূপে তাদের তিনি গড়লেন। তারপর ঈশ্বর তাদের আশীর্বাদ করে বললেন, তোমাদের বংশবৃদ্ধি হোক।’– ‘বাইবেল তো ধর্মগ্রন্থ। আমি পড়াই বিজ্ঞান।’ ‘যে-বিজ্ঞান ছেলেমেয়েদের বাইবেল-বিরোধী কথা শেখায় সে-বিজ্ঞান পড়ানো এই টেনেসি স্টেটে আইনত নিষিদ্ধ।‘ স্কোপকে ছাঁটাই করা হল। তখন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানশিক্ষিত যুক্তিবাদীরা স্কোপ্সের হয়ে টেনেসি স্টেটের ডেটন শহরে মামলা লড়লেন। গোঁড়ামি-বিরোধী অজ্ঞেয়বাদী তীক্ষ্ণবুদ্ধি আইনজীবী ক্ল্যারেন্স ড্যারো এগিয়ে এসে সওয়াল করলেন। তিনি অগ্নিবর্ষী এক ভাষণে বললেন, “মধ্যযুগে জ্ঞানচর্চা বিনষ্ট করার জন্য যেসব নির্লজ্জ দুঃসাহসী প্রয়াস চলেছিল” তাকেও ছাপিয়ে গেছে এই ঘটনা। কিন্তু ফল হল না। শেষ অব্দি ২১ জুলাই ১৯২৫ জন স্কোপ্স বিবর্তন তত্ত্ব পড়াবার জন্য দোষী সাব্যস্ত হলেন, তাঁকে ১০০ ডলার জরিমানা করা হল। এক বিবৃতিতে তিনি বললেন, তাঁর উদ্দেশ্য হল ‘যেকোনো উপায়ে এই আইনের বিরোধিতা করা। এছাড়া অন্য কিছু করলে সেটা হবে শিক্ষার স্বাধীনতা সম্পর্কে আমার আদর্শ-বিরোধী কাজ। আমাদের সংবিধানে ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার যে-নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে সেই অনুযায়ী সত্য শিক্ষাদানই আমার আদর্শ।’ এদিকে আপিলের জন্য মামলা চলে যায় সুপ্রিম কোর্টে। বস্তুত আইনজীবী ড্যারো সেটাই চাইছিলেন। সুপ্রিম কোর্টে মামলা চললে বহু লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে। তা কিন্তু হল না। সুপ্রিম কোর্ট একটা প্রকরণগত ত্রুটি দেখিয়ে টেনেসির নিম্ন আদালতের রায় খারিজ করে দিয়ে বলল, ‘এই বিদঘুটে মামলাটাকে আর টেনে নিয়ে গিয়ে লাভ নেই।’ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গোঁড়া বিজ্ঞান-বিরোধী মহল জোর ধাক্কা খেল। যে-পনেরোটি স্টেট বিবর্তন তত্ত্ব পড়ানো নিষিদ্ধ করেছিল, দুটি স্টেট বাদে তারা সবাই সে আইন তুলে নিল। তুলল না শুধু আরকানসাস এবং মিসিসিপি। স্কোপসের বিচার নিয়ে ১৯৫৫ সালে নিউ ইয়র্কের নাট্যপাড়া ব্রডওয়েতে ইনহেরিট দ্য উইন্ড (উত্তরাধিকারের ঘরে শূন্য) নামে একটি নাটক হয়েছিল। পরে ওই নামেই ১৯৬০ সালে হলিউডে একটি তারকাখচিত চলচ্চিত্র সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯৯-তে ওই চলচ্চিত্রের একটি টেলি-রূপান্তর হয়। এইখানেই মজা। এত ক্ষমতা এত টাকা থাকলে কী হবে, শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান-বিরোধীদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তা নাহলে ইনহেরিট দ্য্ উইন্ড্-এর মতো নাটক/চলচ্চিত্র এতখানি জনপ্রিয় হতে পারত না।