বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখনও সমুদ্রের অনেক রহস্য অজানা। সূর্যের আলো যেখানে পৌঁছয় না, সেই অন্ধকার জলরাশিতে কীভাবে প্রাণীরা বেঁচে থাকে এবং খাদ্যশৃঙ্খল কাজ করে, এই প্রশ্নের অনেকটাই এতদিন জানা ছিল না। এবার সেই অজানার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ সামনে আনছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশনের গবেষকরা মাঝারি আকারের একটি মাছের কথা বলছেন, যাকে গবেষকরা এতদিন তেমন গুরুত্ব দেননি। এই মাছই আসলে পুরো সমুদ্রের খাদ্যজালের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাছটি থাকে সমুদ্রের তথাকথিত “গোধূলি অঞ্চলে”। অঞ্চলটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০ থেকে ১,০০০ মিটার গভীরে। এখানে আলো খুব কম, কিন্তু প্রাণের ঘনত্ব বেশি। বিজ্ঞানীরা জানতেন, এই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ জীবজগৎ রয়েছে, কিন্তু তারা কীভাবে উপরের স্তরের প্রাণীদের সঙ্গে যুক্ত, তা এতদিন পরিষ্কার ছিল না। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এই মাছগুলি দিনে গভীর জলে থাকে এবং রাতে উপরের দিকে উঠে আসে খাবার খেতে। এই নিয়মিত উপরে-নীচে চলাচলকেই বিজ্ঞানীরা বলছেন “দৈনিক উল্লম্ব চলাচল”। এর মাধ্যমেই গভীর সমুদ্রের শক্তি ও খাদ্য উপরের স্তরে পৌঁছায়। সহজভাবে বললে, এই মাছগুলি গভীর সমুদ্রের খাবার উপরের স্তরের প্রাণীদের কাছে পৌঁছে দেয়। আবার উপরের স্তরের শক্তি ও পুষ্টি তারা নীচে নামিয়ে আনে। এতদিন এই কাজটি ঠিক কোন প্রাণী করছে, তা স্পষ্ট ছিল না। এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই মাঝারি আকারের মাছগুলিই হল, সেই ‘হারানো সূত্র’। এই মাছগুলি না থাকলে গভীর সমুদ্র ও উপরের সমুদ্রের মধ্যে খাদ্য ও শক্তির আদান-প্রদান অনেকটাই ব্যাহত হতো। বড় শিকারী মাছ, যেমন- টুনা বা হাঙর, মাঝেমধ্যে গভীর জলে নেমে যায়। তার কারণ, এই মাঝারি মাছগুলিই তাদের খাদ্যের বড় অংশ। এই আবিষ্কার সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খল সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে দিচ্ছে। এতদিন গভীর সমুদ্রকে অনেকটা ‘বিচ্ছিন্ন জগত’ বলে মনে করা হতো। কিন্তু নতুন তথ্য বলছে, গভীর সমুদ্র আসলে উপরের সমুদ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। মাছগুলির সংখ্যা এবং আচরণ বদলে গেলে পুরো সামুদ্রিক পরিবেশে তার প্রভাব পড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি সমুদ্রের তাপমাত্রা বা অক্সিজেনের মাত্রা বদলে যায়, তাহলে মাছগুলির চলাচলও বদলাতে পারে। এর প্রভাব পড়বে বড় মাছ, এমনকি গোটা সামুদ্রিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার উপরও। তবে গবেষণাটি শুধু যে সমুদ্রের প্রাণীদের সম্পর্কে নতুন তথ্য দিচ্ছে তা নয়, জলবায়ু পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ পৃথিবীর কার্বন চক্র ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমুদ্রের একটা বড় ভূমিকা আছে। গভীর সমুদ্রের জীবজগৎ কীভাবে কাজ করে, তা বোঝা মানে জলবায়ুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া।
সূত্র: Movement ecology of a deep-pelagic mesopredator, the bigscale pomfret: implications for pelagic food web connectivity and fishery susceptibility. Marine Ecology Progress Series, 2025.
