বিবর্তনে আমাদের থিয়েটার

বিবর্তনে আমাদের থিয়েটার

Posted on ৮ এপ্রিল, ২০১৯

১/ অতি-পরিচিত চার্লস ডারউইন নামক বিজ্ঞানীর মস্তিষ্কপ্রসূত বিবর্তনের তত্ত্ব কি থিয়েটারের ইতিহাসের নিরিখে একবার বিবেচনা করা যায় ? এই প্রশ্ন থেকেই এই নিবন্ধটির যাত্রা শুরু।
বিবর্তনের মূল হল অভিযোজন। পৃথিবীর নানান বদলের সঙ্গে সঙ্গে যে প্রজাতি খাপ খাওয়াতে পেরেছে সেই’ই টিকে গেছে। ঘটছে যোগ্যতমের উদবর্তন এবং অযোগ্যের বিলুপ্তি। এই যোগ্যতা হল চারপাশের প্রাকৃতিক-ভৌগলিক পরিবর্তনের সঙ্গে টক্কর দেবার ক্ষমতা। সহজভাবে আমরা বুঝি যে, বানর থেকে মনুষ্যের গতি ডারউইনের মতে যুক্তিসিদ্ধ। জীবজগতের আদিম অবস্থা থেকে বর্তমান অবস্থার সময়প্রবাহের থেকে অনেক বাস্তব উদাহরণকে যুক্তি মেনেছেন বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা। এই নিয়ে বিতর্কেরও অবকাশ আছে। সেটি জীববিজ্ঞান ও নৃতত্ত্বের বিষয় । আমাদের ইচ্ছে যে, থিয়েটারকে এই ‘যোগ্যতমের জয়’ ও ‘অভিযোজন’ এই দুই বিষয়ের আলোতে একবার দেখা। আমাদের বাংলা থিয়েটারকেই দেখা।

২/ গেরাসিম লেবেদফের হাত ধরে মাইকেল, দীনবন্ধু, গিরিশ পেরিয়ে নব্য রবীন্দ্রনাথের আইডিয়া-নির্ভর নাটক ছুঁয়ে স্বাধীনতা পরবর্তী গণনাট্য সংঘ। শম্ভু মিত্র, উৎপল, অজিতেশ পেরিয়ে মনোজ-মোহিত-দেবাশিষ হয়ে ব্রাত্য বসু। এই রকম দীর্ঘ যাত্রার গতিপথটিকে নজর করলে সত্যিই নাটকের সবরকম বিবর্তনের একটি স্পষ্ট রেখা পাওয়া যাবে। দিশি থিয়েটারের উন্নতি করার জন্য মাইকেল যে যে নাটকগুলি লেখেন তার মধ্যে ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ এখনো অবধি প্রযোজনাযোগ্য – এই নাটকের ভাষার সঙ্গে দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী’–র মিল আছে তামাসা, কৌতুক ও হাস্যরসের ছলে সত্য বলা বা প্রতিবাদকে রাখা। কুলীনকুলসর্বস্ব কী পদ্মাবতী তখন পছন্দ হলেও সেই রীতিটি চলল না। কৃত্রিম নকলনবিশি ও স্বাভাবিক নাট্যচলনের মধ্যে দ্বিতীয়টিরই অভিযোজন হল এবং এই সহজ কিন্তু মানবিক থিয়েটারই গ্রহণ করলেন উৎপল দত্ত। এই বিবর্তনের মধ্যে থিয়েটারে এলো বাহ্যিক প্রভাব মানে বিদেশি নাটকের অনুবাদ ও আত্তীকরণ। শম্ভু মিত্র রবীন্দ্রনাথ ছাড়া যে বিখ্যাত কাজগুলি করলেন তার মধ্যে আছে ইবসেনের ‘দি ডলস হাউস’ নিয়ে লেখা ‘পুতুলখেলা’; ইবসেনের ‘এনিমি অফ দ্য পিপল’ নিয়ে দশচক্র এবং অবশ্যই সফোক্লেসের ‘রাজা অয়দিপাউস’। পরে অজিতেশ করেন চেকভ অবলম্বনে ‘দি চেরী অর্চাড’ থেকে ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জুরী’। ব্রেশটের ‘দি গুডম্যান’ অবলম্বনে ‘ভালোমানুষ’। তলস্তয়ের গল্প থেকে ‘পাপপুণ্য’। বিদেশী নাটকের দ্বারা সংশ্লিষ্ট অভিযোজন বাংলা থিয়েটারকে আন্তর্জাতিক মানের বিবর্তিত নাট্যসম্পদের সঙ্গে যুক্ত করতে পারল। এই প্রয়াস এখনো অব্যাহত কেননা থিয়েটার আজ সূত্র নিচ্ছে দিশি ও বিলিতি চলচ্চিত্র থেকে। কোন সন্দেহ নেই। সাহিত্যের অভিযোজনের সঙ্গে থিয়েটারের বিশেষ সম্পর্ক বিদ্যমান কেননা গদ্যসাহিত্যিক নাটক না লিখলেও গদ্যসাহিত্য থেকে নাটক লেখা হয়েছে ও হয়ে চলেছে বারবার অর্থাৎ গদ্যসাহিত্যের একটি বাহ্যিক প্রভাব আছে অবশ্যই। মনে পড়বে শম্ভু মিত্র নির্দেশিত ‘চার অধ্যায়’ বা সুমন মুখপাধ্যায় নির্দেশিত দেবেশ রায়-এর উপন্যাস ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’। লু সুনের গল্প থেকে ‘জগন্নাথ’। প্রেমচন্দ্রের গল্প থেকে দানসাগর ।

৩/ কোন সন্দেহ নেই যে, যে ধারার থিয়েটার বহমান সেই ধারাটিই যোগ্যতম ও অভিযোজিত। কিন্তু এই ধারার মধ্যে বিচিত্র ধরণের ভাগ-উপভাগ আছেই – মেনস্ট্রিম থিয়েটারের যেমন। লোক-নাটকের বিবর্তন সে’রকমটি নয়। এইখানে সামাজিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে থিয়েটারের অভিযোজনের সম্পর্কটি বিচার করা যায়। গিরিশচন্দ্র ছিলেন ম্যানেজার কাম নাট্যকার ও পরিচালক। সম্পূর্ণভাবে ব্যবসাভিত্তিক কাজ। গিরিশকুমার এই প্রাতিষ্ঠানিক বা অন্য অর্থে প্রফেশনাল থিয়েটারের বাহক কিন্তু প্রচুর আর্থিক ক্ষতি সহ্য করেছেন। প্রফেশনাল থিয়েটারের পরে শ্যামবাজারের-হাতিবাগানের কিছু মঞ্চে বৃহস্পতি-শনি-রবি অভিনীত হতে থাকল – স্টার, বিশ্বরূপা, ব্রহ্মনা। অন্যদিকে গন-প্রফেশনাল গ্রুপ থিয়েটার গড়ে উঠল একটি সামাজিক আন্দোলনের রাস্তা হিসাবে যেখানে পকেটের পয়সা দিয়ে লোকসানের থিয়েটার হত। টেলিভিশন- সিনেমার প্রতিযোগিতার চাপে শ্যামবাজারের থিয়েটার ক্রমে ‘অযোগ্যতম’ , হল ও শূন্য হয়ে গেল। গ্রুপ থিয়েটার তখন খানিকটা প্রোফেশানাল হবার চেষ্টা করল এবং গ্রুপ থিয়েটারের নাটক ‘হিট’ করতে থাকল। সম্ভবত নাটকের ভিতরের মানের দিক থেকে শ্যামবাজারের থিয়েটারের দর্শকের মনের মতো করে বিবর্তিত হতে পারল না। কিন্তু লোক-কাঁদানো বা লোক-হাসানো থিয়েটারের কাজ কোনো কোনো দল করতে থাকল। ইতিমধ্যে নাট্যমেলা, কল শো – ইত্যাদির পর এলো সরকারি অনুদান। খাতায়, কলমে, হিসাবে, কাগজপত্রে, ইন্টারনেটে যথেষ্ট দখল না থাকলে আজ অনুদান পাওয়া শক্ত। সুতরাং পৃথিবীব্যাপী যে টেকনিকাল বিবর্তন ঘটে চলেছে, তথ্যপ্রযুক্তির যে বিপ্লব তার সঙ্গে এক তালে পা ফেলে থিয়েটারকে অভিযোজনের পথে যেতে হবে। টেলিভিশনের উদ্ভবের পরেই সিনেমার প্রতিপক্ষ হিসাবে এসেছে সিরিয়াল, আবার দামী বাজেটের ছবির সঙ্গে থাকছে কম বাজেটের শর্টফিল্ম, দামী থিয়েটারের পাশে থাকছে ছোট্টঘরের ইন্টিমেট থিয়েটার। অনেক থিয়েটারের মানুষ বলছেন একদিন এই থিয়েটার আর যুদ্ধ করতে পারবে না। একপাশে প্রান্তিক শিল্প হয়ে থাকবে। থাকবে শুধু বড় কোম্পানি থিয়েটার। বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে সঙ্গে ছোটখাটো বিনিয়োগ কিন্তু বাঁচে কেননা কিছু ক্রেতা সন্দেশ কিনবে, কিছু ক্রেতা গুঁজিয়া। এই ক্রেতা হল দর্শক। দর্শকের রুচি ও মনের কি বিবর্তন ঘটবে সেইটা দেখার জন্যেই থিয়েটারকে কাজ করে যেতে হবে। চার্লস ডারউইনের মূল কথাটি যেন থিয়েটারের মধ্যেই এইভাবে খুঁজে পাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 + 18 =