
চার্লস ডারউইন প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। কিভাবে প্রাণীরা প্রজন্মের পর প্রজন্মে অভিযোজিত হয় এবং টিকে থাকে সেই নিয়ে কথা বলে তাঁর তত্ত্ব। তবে, জিনতত্ত্ব ও বায়োইনফরমেটিক্সের নতুন নতুন অগ্রগতি, ডারউইনের এই ধারণা থেকে একটি প্রশ্ন রাখে যা এখনও বিজ্ঞানীদের ভাবায় – বিবর্তনের পথে কোন বিষয়টি ‘অভিনবত্ব’কে পরিচালিত করে ? কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা, এ বিষয়ে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে ও কিছু চাঞ্চল্যকর উত্তর দিয়েছে। ডিএনএ পরিবর্তনগুলি রয়েছে বিকাশের কেন্দ্রে। এই পরিবর্তনগুলি জীবনের বৈচিত্র্যকে উদ্দীপিত করে। কখনও কখনও তারা এমন বৈশিষ্ট্য তৈরি করে যা আমাদের বিস্মিত করে। আবার প্রাণঘাতী বৈশিষ্ট্য, যেমন মারক ভাইরাসের মিউটেশনও তৈরি করে। এক্ষেত্রে ডিএনএ-র পরিবর্তনকে বোঝা নিছক বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, বরং বাস্তুতন্ত্র রক্ষা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। “আমরা জিনোম থেকে তথ্য বের করার একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছি এবং জীববৈচিত্র্যের মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্যকে চালিত করার শক্তিগুলিকে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি,” বলেছেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড ডুচেন। দলটি এই গবেষণার জন্য, পাখিদের ‘বিষয়’ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু সব ছেড়ে পাখিই কেন! কারণ তারাই মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়। পাখিদের মধ্যে প্রায় ১০,০০০ প্রজাতি সক্রিয়ভাবে বিদ্যমান। “আমরা শনাক্ত করেছি কোন কোন মূল উপাদান পাখির বংশগতি এবং হাজার হাজার জিনকে বিবর্তিত করেছে,” ডুচেন ব্যাখ্যা দেন। তাঁদের পদ্ধতিটি চারটি মূল বিবর্তনীয় উপাদান শনাক্ত করেছে: পাখির ডিমের সংখ্যা, জিনের রসায়ন, ক্রোমোসোমের আকার এবং পায়ের দৈর্ঘ্য। ডুচেন বলেন, ” এই ফলাফলগুলি এ ধারণা ভেঙে দেয় যে কেবলমাত্র একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যই, সেটা ওড়ার বৈচিত্র্য বা গান গাওয়া হতে পারে, একটি গোষ্ঠীর বিবর্তনকে আলাদা করে দেয়, তাদের পরিচালনা করে। একাধিক প্রজাতি ও জিনকে বিস্তারিতভাবে দেখলে আপনি এই ‘অভিনবত্ব’র চালক উপাদানগুলির মধ্যে আরও অনেক সূক্ষ্মতা পাবেন। জিনগত রসায়ন হোক বা ক্রোমোসোম কিংবা জীবনযাত্রার ভিন্ন ভিন্ন দিক, সবই এই অভিনবত্ব আনার ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করে,” বলেন ডুচেন। এগুলি কেবল একটি নয়, অনেকগুলি উপাদানের মিলিত ফসল। গবেষণাটি থেকে দেখা যায়, কিভাবে প্রতিটি অংশ, জিনের গঠন থেকে শারীরিক বৈশিষ্ট্য, জীবনের ধারাকে গঠন করতে সাহায্য করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষজ্ঞদের হাতে বিভিন্ন জীবের মধ্যে পরিবর্তনগুলি পর্যবেক্ষণ করার একটি উপযোগী সরঞ্জাম এনে দিয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলগুলি পাখি জগতের বাইরেও প্রযোজ্য। এ থেকে পারিপার্শ্বিক অনেক জীবের জীবনের বিবর্তন সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা যায়। এই পদ্ধতি রোগের বিবর্তন অনুসন্ধান করতেও সাহায্য করবে বিজ্ঞানীদের। রোগগুলি কীভাবে মানব জীবনের বা জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজিত হয় তা বোঝা যাবে। এমনকি কীভাবে উদ্ভিদগুলি জলবায়ু পরিবর্তনে প্রতিক্রিয়া জানায়, তা বুঝতেও সাহায্য করে। আমাদের বর্তমান জীববৈচিত্র্য সংকটে, কোন কোন জীব হারিয়ে যাবার ঝুঁকিতে আছে তাও বলে দিতে পারে এই আবিষ্কৃত পদ্ধতি। “ওই নীতি, পাখির বৈচিত্র্যের রহস্যোদ্ধার করতে সাহায্য করে। মহামারী থেকে প্রজাতির অভিযোজন পর্যন্ত সবকিছুর জন্য জিনগত পরিবর্তনগুলির চালিকা শক্তি নিয়ে তদন্ত করার কাজে একে ব্যবহার করা যেতে পারে,” বলেন ডুচেন। বাস্তবে, কী কারণে প্রাণীগুলি এমন অভিনব এবং অনন্য, তারা আমাদের বিবর্তন সম্পর্কে কী শিখিয়েছে যা আমরা সংরক্ষণ করতে চাই – এ সবই উঠে আসতে পারে এ গবেষণা থেকে। প্রতিটি বিলুপ্ত প্রজাতি বিবর্তন কাহিনীর একটি অধ্যায়ে নিয়ে যায়। যা যা রয়ে যাচ্ছে, তাদের রক্ষা করতে হবে আমাদের – কেবল ভবিষ্যতের আবিষ্কারের জন্য নয়, প্রকৃতির স্বার্থেও। বিজ্ঞানীরা এখন বিকাশের চালক উপাদানগুলিকে আরো স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করতে পারছেন। পাখির বৈচিত্র্য উদঘাটনে ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলি শীঘ্রই আমাদের নতুন মহামারির উদ্ভব নিয়ে তথ্য দিতে পারবে। এই গবেষণাটি চিন্তাভাবনার পরিবর্তনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে – বিবর্তনকে একটি ধীর ও দূরবর্তী প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে, একটি গতিশীল ও প্রবহমান প্রক্রিয়া হিসাবে ভাবা যেতে পারে। প্রকৃতিতে এখনও অনেক গোপন রহস্য রয়েছে। জীবন কিভাবে অবিরত টিকে থাকতে ও বিবর্তিত হতে থাকে তা বোঝার দিকে এক ধাপ এগিয়ে দেয় এই গবেষণা।