ইদানিং আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক বিরল আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতু, 3I/ATLAS। নতুন গবেষণা বলছে, এই ধূমকেতুটির বয়স হতে পারে প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ, এটি হয়তো আমাদের ছায়াপথের জন্মের খুব অল্প সময় পরেই গঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে 3I/ATLAS-কে “আক্রমণকারী’’ বলা হচ্ছে, কারণ এটি আমাদের সৌরজগতের বাইরে থেকে এসেছে। এখনও পর্যন্ত এধরনের মাত্র তিনটি বস্তু শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো অন্য নক্ষত্রমণ্ডল থেকে আমাদের মহাকাশ-পরিসরে প্রবেশ করেছে। ২০২৫ সালে যখন এটি আবিষ্কৃত হয়, তখন এর গতি ছিল সেকেন্ডে প্রায় ৫৮ কিলোমিটার । অর্থাৎ এটি এখনও অবধি পাওয়া সবচেয়ে দ্রুতগামী ধূমকেতু। পূর্বে আবিষ্কৃত 1I/’Oumuamua এবং 2I/Borisov-এর চেয়েও অনেক বেশি গতিসম্পন্ন।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোনো আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তুর গতি যত বেশি, তার বয়সও তত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে এটি বিভিন্ন নক্ষত্রের কাছাকাছি দিয়ে যাওয়ার সময় মহাকর্ষীয় “স্লিংশট’’ প্রভাব বারবার এর গতিকে ত্বরান্বিত করেছে। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে অ্যাস্টার টেইলর এবং ড্যারিল সেলিগম্যান এই ধারণা উত্থাপন করেন যে 3I/ATLAS-এর ‘গতিগত বয়স’(কাইনাম্যাটিক) বয়স ৩ থেকে ১১ বিলিয়ন বছরের মধ্যে হতে পারে। এই হিসাবের মধ্যে অবশ্য অনিশ্চয়তা ছিল। তবে নতুন এক গবেষণা বেশি বয়সের পক্ষে জোরালো প্রমাণ দিয়েছে। নাসা গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের বিজ্ঞানী মার্টিন কর্ডিনার-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় ধূমকেতুটির আইসোটোপিক গঠন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ-এর বিশেষ যন্ত্র নিয়ার-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোমিটার (এন-আই-আর-স্পেক)। এর মাধ্যমে 3I/ATLAS-এ কার্বন-১২ ও কার্বন-১৩ আইসোটোপের অনুপাত এবং জলে ডিউটেরিয়াম (এক ধরনের হাইড্রোজেন আইসোটোপ) কতটা রয়েছে তা নির্ণয় করা হয়। এই দুটি তথ্য ধূমকেতুর বয়স ও উৎস নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইসোটোপ মানে একই মৌলের এমন পরমাণু, যাদের প্রোটনের সংখ্যা সমান হলেও নিউট্রনের সংখ্যা ভিন্ন। যেমন, কার্বন-১২-তে ৬টি প্রোটন ও ৬টি নিউট্রন থাকে, আর কার্বন-১৩-তে ৬টি প্রোটন ও ৭টি নিউট্রন। একইভাবে, ডিউটেরিয়ামে একটি প্রোটন ও একটি নিউট্রন থাকে, যেখানে সাধারণ হাইড্রোজেনে থাকে শুধু একটি প্রোটন। গবেষণায় দেখা গেছে, 3I/ATLAS-এ কার্বন-১২-এর পরিমাণ কার্বন-১৩-এর তুলনায় অনেক বেশি। এই বৈশিষ্ট্য আমাদের সৌরজগতের কোনো ধূমকেতু বা নিকটবর্তী নক্ষত্রগঠনে দেখা যায় না। ফলে স্পষ্টত, এই ধূমকেতুর উৎপত্তি আমাদের আশপাশে নয়। এটি এসেছে বহুদূরের কোনো প্রাচীন মহাজাগতিক পরিবেশ থেকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমে এবং নক্ষত্রগঠনের মেঘে কার্বন-১৩-এর পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তাই যেখানে কার্বন-১৩ কম এবং কার্বন-১২ বেশি, সেখানে বস্তুটি অনেক পুরোনো বলে ধরে নেওয়া যায়। কারণ এটি এমন সময় তৈরি হয়েছে, যখন কার্বন-১৩ তখনও বেশি পরিমাণে গঠিত হয়নি। একইভাবে, ডিউটেরিয়ামের উপস্থিতিও ধূমকেতুর গঠনকাল সম্পর্কে ধারণা দেয়। প্রাচীন মহাজাগতিক পরিবেশে এই আইসোটোপের ভিন্ন অনুপাত পাওয়া যায়, যা বর্তমান সময়ের তুলনায় আলাদা। সব মিলিয়ে, 3I/ATLAS-এর আইসোটোপ ঘটিত বৈশিষ্ট্য ইঙ্গিত দেয় যে এটি আমাদের গ্যালাক্সির একেবারে প্রারম্ভিক যুগে তৈরি হয়েছে। গ্যালাক্সি বিবর্তনের মডেল ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, এই ধূমকেতুটির বয়স সম্ভবত ১০ বিলিয়নেরও বেশি। আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তুগুলোর মাধ্যমে আমরা আসলে আমাদের নিজস্ব সৌরজগতের বাইরের অজানা জগতের বার্তা পাই, যা ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দেয়।
সূত্র: Space . com ; March, 2026.
