বিস্ময়কর উপগ্রহ প্রযুক্তি

বিস্ময়কর উপগ্রহ প্রযুক্তি

কিশোর রায়
পি এইচ ডি স্কলার, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
Posted on ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫

উপগ্রহ চিত্র প্রযুক্তি আজ আমাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। জলবায়ু পরিবর্তনের পর্যবেক্ষণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস, এমনকি জিপিএস (GPS) ব্যবহার করে আমাদের প্রিয় রেস্তোঁরা বা কফি হাউসে পৌঁছাতেও তা সাহায্য করে। উপগ্রহ চিত্র বলতে এমন ছবিকে বোঝানো হয় যা মহাকাশে পাঠানো ঘূর্ণায়মান উপগ্রহের মাধ্যমে তোলা হয়। সে ছবি পৃথিবীর বা অন্য কোনও জ্যোতিষ্কের পৃষ্ঠভাগের হতে পারে । উপগ্রহ চিত্র পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগ ও তার বাইরেও সার্বিক দৃশ্য দেখার সুযোগ করে দিয়েছে, পরিবেশের নজরদারিতেও সহায়তা করেছে।
মহাকাশ থেকে প্রাপ্ত এই উন্নত গুণসম্পন্ন ছবিগুলি বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিভিন্ন শাখাকে বদলে দিয়েছে এবং গ্রহ সম্পর্কে আমাদের ধারণা আরও সমৃদ্ধ করেছে। উপগ্রহ চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ হয় পরিবেশ পর্যবেক্ষণে । ভূমি আচ্ছাদন, মেঘের আচ্ছাদন, বনাঞ্চল এবং জলাশয়ের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মূল্যায়ন করতে পারেন, অরণ্য ধ্বংসের প্রবণতা অনুসরণ করতে পারেন, দাবানল, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এই তাৎক্ষণিক তথ্যব্যবস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বিপর্যয় মোকাবিলায় সাড়া দিতে সাহায্য করে।
কৃষিক্ষেত্রে, নিখুঁত চাষাবাদ করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে উপগ্রহ চিত্র। উপর থেকে তোলা উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে কৃষকরা ফসলের স্বাস্থ্য, মাটির আর্দ্রতা এবং কীটপতঙ্গের আক্রমণ পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এগুলি তাঁদের সেচ, সার প্রয়োগ এবং কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। ফলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং টেকসই চাষাবাদের পদ্ধতি বজায় থাকে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের কাজে লাগে। শহর পরিকল্পনা এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রেও উপগ্রহ চিত্র মস্ত ভূমিকা পালন করে। এর সাহায্যে পরিকল্পনাবিদরা শহরের বিস্তার, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং যানবাহন প্রবাহের নকশা বিশ্লেষণ করতে পারেন, যা কার্যকর ও উন্নত শহর রূপায়নে সহায়ক। এছাড়াও, উপগ্রহ চিত্রগুলি ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থার (GIS) সাহায্যে নকশা প্রস্তুত করা এবং তা সংশোধন করার মাধ্যমে পথনির্দেশনায় সহায়তা করে। এটি পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। উপগ্রহ চিত্র প্রত্নতত্ত্বের ক্ষেত্রেও অমূল্য প্রমাণিত হয়েছে। গবেষকরা উপগ্রহ চিত্রপ্রযুক্তির সাহায্যে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, মাটির নিচে চাপা পড়া কাঠামো এবং এমন সব ঐতিহাসিক স্থান চিহ্নিত করতে পারেন, যা মাটি থেকে দৃশ্যমান নয়। এর ফলে যুগান্তকারী অনেক আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে।
উপগ্রহ চিত্র যুগের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৬ সালে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভি-২ রকেট উৎক্ষেপণ করে, যা পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০৫ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে থেকে ছবি তুলেছিল। সেই প্রাথমিক ছবিগুলি পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগের বক্রতাকে দেখিয়েছিল এবং ভবিষ্যতের উন্নতির পথ প্রশস্ত করেছিল। প্রথম প্রকৃত সাফল্য এসেছিল ৪ অক্টোবর ১৯৫৭-তে, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পুটনিক ১ উৎক্ষেপণ করে। কল্পনা করুন একটি বড় ফুটবল আকারের বস্তু পৃথিবীর চারপাশে কক্ষপথে ঘুরছে এবং “বিপ-বিপ” শব্দ করছে—এটিই ছিল মহাকাশ যুগের সূচনা। যদিও স্পুটনিক ১ -এ কোনও ক্যামেরা ছিল না, তবু এটিই পৃথিবীর কক্ষপথে উপগ্রহ স্থাপনের সম্ভাবনা প্রদর্শন করেছিল। এর পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৮ সালে এক্সপ্লোরার ১ উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে, যা মহাকাশ অনুসন্ধানে আরও অগ্রগতি এনেছিল।
১৯৬০ সালে নাসা, টেলিভিশন ইনফ্রারেড অবজারভেশন স্যাটেলাইট -১ (TIROS-1) উৎক্ষেপণ করেছিল, যা ছিল টেলিভিশন ক্যামেরা সহ প্রথম উপগ্রহ। তা মেঘের আচ্ছাদনের ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এই উন্নয়ন আবহাওয়াবিদ্যায় বিপ্লব এনেছিল এবং আরও সঠিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব করেছিল। ১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশকে, নিম্বাস সিরিজের উৎক্ষেপণের সাথে সাথে উপগ্রহ চিত্র আরও উন্নতি লাভ করে, পরিবেশ তত্ত্বাবধানের জন্য বিশদ ছবি পাঠাতে সক্ষম হয়। ১৯৭২ সালে শুরু হওয়া ল্যান্ডস্যাট প্রোগ্রাম পৃথিবী পর্যবেক্ষণের একটি ভিত্তি হয়ে ওঠে। ল্যান্ডস্যাট উপগ্রহগুলি পৃথিবীর পৃষ্ঠের উন্নত গুণসম্পন্ন ছবি তোলে, যা ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, কৃষি এবং বনায়নে সহায়তা করেছিল।
১৯৮০ এর দশকে শুরু হয় উপগ্রহ চিত্রের বাণিজ্যিকীকরণ। ফ্রান্সের কোম্পানিগুলি, যেমন সাতেলিত পুর ল’বজারভেসিয় দ্য লা তের (SPOT) উচ্চ রেজোলিউশনযুক্ত ছবি তুলে পাঠাতে শুরু করে। বিভিন্ন প্রয়োজনে, যেমন কৃষি, মানচিত্রণ এবং শহর পরিকল্পনায় তা কাজে লাগে। বাণিজ্যিক উপগ্রহ, অধিক পরিমাণ তথ্যের সহজলভ্যতার নতুন পথ খুলে দিয়েছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং ব্যবসায়িক উদ্যোগের জন্য। ১৯৯০ এর দশক এবং ২০০০ এর প্রথম দিকের বছরগুলিতে উপগ্রহ চিত্র প্রযুক্তিতে সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার (SAR) এবং মাল্টিস্পেক্ট্রাল ইমেজিং -এর ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচুর উন্নতি হয়। ফলস্বরূপ পৃথিবীর পৃষ্ঠ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত এবং বৈচিত্র্যময় তথ্য পাওয়া শুরু হয়। রেডারস্যাট (RADARSAT), ইকোনোস (IKONOS) এবং কুইকবার্ড (QuickBird) -এর মতো উপগ্রহগুলির উৎক্ষেপণ চিত্রপ্রযুক্তির রেজোলিউশন আরও বৃদ্ধি করে এবং ব্যবহারের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত করে।
বস্তুত মহাকাশ থেকে বিশদ ও সঠিক তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা আমাদের পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ, পরিচালনা এবং বোঝার পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen + 7 =