বোনোবোর কল্পনাশক্তি 

বোনোবোর কল্পনাশক্তি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বিশ্বজুড়ে প্রাইম্যাটোলজিস্টদের কাছে কানজি ছিল এক জীবন্ত কিংবদন্তি। সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ আর বিশেষভাবে তৈরি কিবোর্ডের সাহায্যে বছরের পর বছর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই ৪৪ বছর বয়সি বোনোবোটি কিছু শব্দ বোঝার এক অভূতপূর্ব ক্ষমতা অর্জন করেছিল। ভাষা কি শুধুই মানুষের একচেটিয়া সম্পত্তি! দশকের পর দশক গবেষণার কেন্দ্রে ছিল কানজি। কিন্তু জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের কগনিটিভ বিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার ক্রুপেনিয়ে এবার ভাষা নয়, পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন কানজির কল্পনাশক্তি নিয়ে। ২০২৫ সালের মার্চে কানজির মৃত্যুর ঠিক আগে, ক্রুপেনিয়ে ও তাঁর সহকর্মীরা আইওয়ার এপ ইনিশিয়েটিভে এক অদ্ভুত নাটক মঞ্চস্থ করেন। দৃশ্যটা যেন শিশুর চা নিয়ে খেলার মতো। একটি খালি জগ থেকে দুটি খালি গ্লাসে তরল ঢালার ভান। একজন মানুষ একটি গ্লাস তুলে আবার সেই “অদৃশ্য” তরল জগে ঢালার অভিনয় করলেন। তারপর কানজিকে বলা হল, কোন গ্লাসে এখনও তরল আছে, সেটার দিকে আঙুল দেখাতে। দুই- তৃতীয়াংশেরও বেশি ক্ষেত্রে কানজি সঠিক গ্লাসের দিকেই ইশারা করে, যেটিতে কল্পিত জুস ছিল। এই প্রথম পরীক্ষাগার-নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রমাণ পাওয়া গেল, মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাইমেটও কল্পিত বস্তু সম্পর্কে ধারণা গঠন করতে পারে। ক্রুপেনিয়ে বলেন, “এটা আমার জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর আবিষ্কার”। অর্থাৎ কল্পনাশক্তি মানুষের একচেটিয়া নয়। বরং এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেল, কল্পনাশক্তির শিকড় হয়তো লক্ষ লক্ষ বছর আগেই, মানুষ-শিম্পাঞ্জি-বোনোবোর বিবর্তনী বিচ্ছেদের আগেই প্রোথিত ছিল। উটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাইম্যাটোলজিস্ট রচনা রেড্ডি বলেন, “এটা পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত হওয়া ভীষণ রোমাঞ্চকর। এতে বোঝা যায়, আমাদের থেকে আলাদা হওয়ার আগেই কিছু মানসিক ক্ষমতা ওদের মধ্যে ছিল।“ এর আগেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বন্দি বা বন্য এপরা মাঝেমধ্যে ‘অন্য জগতে’ ঢুঁ মারছে। কাঠের গুঁড়িকে শিশুর মতো কোলে নেওয়া, খেলনার ভঙ্গি অনুকরণ করা। বহু পুরোনো গবেষণা বলছে, এপরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারে, অন্যের বিশ্বাস বা মানসিক অবস্থা অনুমান করতে পারে। এসবই এমন চিন্তার উদাহরণ, যেখানে বর্তমান মুহূর্তের বাইরে এক ‘অনুকৃত’ বাস্তবতা কাজ করে। কিন্তু কল্পিত বস্তু নিয়ে ধারাবাহিক, পুনরুৎপাদনযোগ্য প্রমাণ—যতক্ষণ না কানজি সেই অদৃশ্য জুসের দিকে আঙুল তোলে তা এতদিন ছিল না । সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা মূলক মনোবিজ্ঞানী আমালিয়া বাস্তোস জানান, “যাওয়ার আগে কানজি আমাদের ধাঁধার আরেকটা ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ টুকরো দিয়ে গেছে”। ২০২৫ সালের সেই সফরে গবেষকরা তিনটি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। চা-খেলার পর আসে আরেকটি পরীক্ষা। এবার কল্পিত জুস নয়, কল্পিত আঙুর। ৪৫ বারের মধ্যে ৩১ বার কানজি সঠিকভাবে সেই ‘অদৃশ্য’ ফলের অবস্থান দেখাতে পারে। সাফল্যের হার কল্পিত তরলের মতনই ছিল। বাস্তব আর কল্পনার ফারাক সে বোঝে কি না, তা যাচাই করতেও পরীক্ষা হয়। এক গ্লাসে সত্যিকারের জুস, অন্যটিতে শুধু অভিনয়। ১৮ বারের মধ্যে ১৪ বার কানজি যেটিতে বাস্তব জুস ছিল, সেই ঠিক গ্লাসটিই বেছে নেয়। এই ফলাফল প্রতীকী যোগাযোগ আর মানসিক প্রতিনিধিত্ব সংক্রান্ত আমাদের ধারণাকে নাড়িয়ে দেবে, বলেন রেড্ডি। তবে গবেষকেরা সতর্কও। কানজির মানসিক ছবি আর শিশুর জটিল কল্পনাময় খেলাধুলার মধ্যে ফারাক আছে। “আমরা দেখাইনি যে কানজি নিজে অভিনয় করছে, সে তরল ঢালছে না, কিন্তু সে অভিনয়টা বুঝছে।“ ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী মাইকেল তোমাসেলো এক্ষেত্রে একমত। তাঁর কথায়, কুকুরের বাটিতে খাবার ঢালার ভান করলে কুকুরও কিছুটা কল্পনা করে। কিন্তু প্রকৃত ‘ভান’ প্রমাণ করতে হলে, কানজিকে নিজেই অভিনয় করতে দেখতে হতো। তবু প্রশ্ন রয়ে যায়, এই ক্ষমতা কি শুধু কানজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল নাকি অন্য বোনোবো ও প্রাণীতেও আছে? গবেষকেরা মনে করিয়ে দেন, এইসকল প্রাণীরা আজ বিপন্ন বা সংকটাপন্ন। তাদের বুদ্ধিমত্তা যত স্পষ্ট হচ্ছে, ততই বাড়ছে নৈতিক দায়িত্ব। বাস্তোস বলেন, “ওদের ভেতরের মানসিক জগৎ সমৃদ্ধ, হয়তো আমরা ওদের প্রাপ্য সম্মান আর সুরক্ষা দিচ্ছি না।”

 

সূত্রঃ science journal, 9th February 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 − 2 =