ব্যক্তিত্বে ভাঙন ধরার রোগ

ব্যক্তিত্বে ভাঙন ধরার রোগ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

কয়েক বছর আগেও বিষয়টা ছিল নিছক ক্লিনিক্যাল কৌতূহল। হঠাৎ করেই বিভিন্ন দেশের মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করতে শুরু করেন, অস্বাভাবিক সংখ্যায় তরুণ-তরুণী নিজেদের ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডারের (ডি আই ডি) শিকার বলে পরিচয় দিচ্ছেন। অর্থাৎ , তাঁদের ব্যক্তিত্ব যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। একাধিক সত্তা, স্মৃতির ফাঁক, পরিচয়ের ভাঙন, সব মিলিয়ে এ এক জটিল মানসিক অবস্থা। অনেক ক্ষেত্রেই রোগ নির্ণয় আসছে রোগীর নিজের কাছ থেকেই। প্রশ্ন উঠল: এই উপসর্গ কি বাস্তব, না কি কল্পনার ফসল? সন্দেহের তীর দ্রুত ঘুরে গেল টিকটকের দিকে। সেখানে কিছু প্রভাবক (ইনফ্লুয়েন্সার) নিজেদের ডি আই ডি আক্রান্ত বলে দাবি করে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তাঁদের ভিডিওতে দেখানো হয় “এক শরীর, বহু ব্যক্তিত্ব”। প্রতিটা আলাদা নাম, আলাদা কণ্ঠ, আলাদা ভঙ্গি। ফলে চিকিৎসকদের চেম্বারে ঢুকে পড়ল এক নতুন দুশ্চিন্তা। সোশ্যাল মিডিয়া কি মানসিক ব্যাধিকে ফ্যাশনে পরিণত করছে? নাকি এতদিন আড়ালে থাকা একটি বাস্তব সমস্যার পর্দা সরাচ্ছে? এই বিতর্ক নতুন নয়। একসময় এর নাম ছিল ‘ বহু ব্যক্তিত্ব সমস্যা’ । নব্বইয়ের দশকে তার নাম বদলে হয় ডি আই ডি —কারণ গবেষকরা বুঝতে পারেন, এ আসলে “ব্যক্তিত্বের আধিক্য” নয়, বরং পরিচয়ের ভাঙন। শৈশবের ভয়াবহ ট্রমা, বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী নির্যাতন বা অবহেলা, মস্তিষ্ককে এমনভাবে ভেঙে দেয় যে একটানা ‘আমি’-র ধারণা আর টেকে না। তবু মানসিক স্বাস্থ্য জগতে একটা সন্দেহ রয়ে যায়, এই উপসর্গগুলো কি সত্যিই ট্রমার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, না কি চিকিৎসা ও কৃষ্টির তৈরি গল্প?

সম্প্রতি নিউরোসায়েন্স সেই সন্দেহে খানিকটা জল ঢেলেছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ডি আই ডি আক্রান্তদের মস্তিষ্কে এমন নির্দিষ্ট নিউরাল সিগনেচার পাওয়া যায়, যা অভিনয় করে বানানো যায় না। অর্থাৎ, এই ব্যাধির বাস্তব জৈবিক প্রভাব রয়েছে। পাশাপাশি, অনুমান করা হচ্ছে, ডিসোসিয়েশন ঘটিত অসুস্থতা জনসংখ্যার প্রায় ৪ শতাংশকে প্রভাবিত করতে পারে। সংখ্যাটা ছোট নয়। অথচ বোঝাপড়া এখনও অন্ধকারে। এই প্রেক্ষাপটেই যুক্তরাজ্যের তিন ট্রমা বিশেষজ্ঞ, হেলেনা ক্রকফোর্ড, পল ল্যাংথর্ন ও ‘অভিজ্ঞতার দৌলতে বিশেষজ্ঞ’ মেলানি গুডউইন সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন এক বিশাল সংকলন। শতাধিক গবেষক, চিকিৎসক ও ভুক্তভোগীর লেখা নিয়ে তৈরি এই বই। যার লক্ষ্য একটাই, ডি আই ডি ঘিরে থাকা মিথ ভাঙা – এটি বিরল নয় আবার কাল্পনিকও নয়। তাছাড়া এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা কীভাবে এই রোগীদের সাহায্য করতে পারেন? ক্রকফোর্ড একে বলেন, “লুকিয়ে থাকা রোগ।“ আমেরিকান সাইকোঅ্যানালিস্ট এলিজাবেথ হাওয়েলের দেওয়া এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, ডিসোসিয়েশনের কাজই হলো নিজেকে লুকিয়ে রাখা। চরম নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য মস্তিষ্ক বাস্তবতাকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। তাই এই রোগ উচ্ছল নয়, নাটকীয়ও নয়। বরং নীরব, গোপন, ধীরে ধীরে ক্ষয়কারী। অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাঁদের অভিজ্ঞতা স্বাভাবিক নয়। কারণ সেটাই তো তাঁদের কাছে ‘স্বাভাবিক’। এক্ষেত্রে আরেকটি বড় কারণ হলো সামাজিক অস্বস্তি। ট্রমা মানে এমন সব সত্য, যা সমাজ দেখতে চায় না। আমেরিকান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জুডিথ হারম্যান লেখেন, সমাজ একদিকে জানতে চায়, অন্যদিকে ভুলে যেতে চায়। এই দ্বৈত মনোভাবের ফলেই ডি আই ডি আজও মূলধারার প্রশিক্ষণে জায়গা পায়নি। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে, ডিসোসিয়েশন একধরনের টিকে থাকার কৌশল, বিশেষ করে যখন সেই ট্রমা আসে কাছের মানুষের হাত থেকে, যার কাছে শিশুটির নিরাপত্তা খোঁজার কথা। এই অসম্ভব দ্বন্দ্ব মস্তিষ্ককে ঠেলে দেয় ভাঙনের দিকে। গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে “ ঘেঁটে যাওয়া সম্পর্ক” থাকলে পরবর্তী জীবনে ডিসোসিয়েশনের ঝুঁকি অনেক বাড়ে। উপসর্গের বৈচিত্র্যও সেখান থেকেই আসে। কেউ অনুভব করেন কিছুই নেই। নিজের শরীরটা যেন শরীর নয়, সময়ের বোধ হারিয়ে ফেলা, স্মৃতির ক্ষত – এমন নানা দিক। আবার কেউ অনুভব করেন খুব বেশি ফ্ল্যাশব্যাক, ভেতরের কণ্ঠস্বরের কোলাহল। এর শারীরিক সমস্যাও কম নয়। সব সময় ক্লান্তি, ফাইব্রোমায়ালজিয়া বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যাখ্যাতীত স্নায়বিক উপসর্গ। চিকিৎসার প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা একমত, এটা কোনো জাদুকরি ওষুধে সারার রোগ নয়। ওষুধ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু মূল কাজটা করতে হয় মনস্তাত্ত্বিক থেরাপিকে। প্রথম ধাপ নিরাপত্তা ও স্থিতি ফেরানো। দ্বিতীয় ধাপ ট্রমা প্রসেসিং। তৃতীয় ধাপ নতুন করে জীবনে ফিরে আসা, শিক্ষা, কাজ, সম্পর্ক গড়া। ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার তাই কোনো টিকটক জাত প্রবণতা নয়, মানব মস্তিষ্কেরই এক চরম অভিযোজন। যেন বেঁচে থাকার জন্যই মন কত দূর যেতে পারে। প্রশ্ন শুধু, আমরা কি সেই ভাঙা টুকরোগুলোকে বুঝতে এবং জোড়া লাগাতে প্রস্তুত?

 

সূত্র: How Dissociation Blunts Trauma By Kristen French January 30, 2026; Nautilus

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 + 11 =