ব্যথা উপশমে গাঁজা? 

ব্যথা উপশমে গাঁজা? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ জানুয়ারী, ২০২৬

মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর স্থায়ী ব্যথা—যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ক্রনিক পেইন, তা বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এই দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণার উপশমে সাম্প্রতিক সময়ে ক্যানাবিস বা গাঁজা-ভিত্তিক পণ্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অগাধ প্রত্যাশা। অনেকের বিশ্বাস, প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া এই উপাদান হয়তো আধুনিক ওষুধের সীমাবদ্ধতা ভেঙে সত্যিই অপ্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে। কিন্তু বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক রায় বলছে, এই আশার ভিত খুব শক্ত নয়। ক্যানাবিস থেকে প্রাপ্ত স্বস্তি খুবই সীমিত এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও।

আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ানস-এর উদ্যোগে এক পর্যালোচনায় ২,৩০০ জনের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ওপর পরিচালিত ২৫টি স্বল্পমেয়াদি, প্লাসেবো-নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল—ক্যানাবিসের দুটি প্রধান উপাদান, টিএইচসি (যা নেশাজনিত হাই তৈরি করে )ও সিবিডি (যাকে প্রায়ই নিরাপদ ব্যথানাশক হিসেবে প্রচার করা হয়) দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা কমাতে কতটা কার্যকর এবং সেগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কতখানি তা নিরূপণ করা।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, টিএইচসি-সমৃদ্ধ পণ্য কিছু ক্ষেত্রে ব্যথার তীব্রতা সামান্য কমাতে পারে, বিশেষ করে স্নায়ুঘটিত বা নিউরোপ্যাথিক ব্যথার ক্ষেত্রে। এই ধরনের ব্যথায় জ্বালা, ঝিনঝিনে অনুভূতি বা হঠাৎ বিদ্যুৎঝলকের মতো যন্ত্রণা দেখা যায়। তবে এই স্বস্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী ও সীমিত। এমন নয় যে এতে অদূর ভবিষ্যতে রোগীর আর ব্যথা হবে না।

অন্যদিকে, সিবিডি-নির্ভর বা কম টিএইচসি যুক্ত পণ্যগুলোতে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যথা উপশমের প্রমাণ মেলেনি। সিবিডিকে প্রায়ই নিরাপদ ও প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে বাজারজাত করা হয়। এই গবেষণা কিন্তু সেই দাবিকে সমর্থন করেনি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেখানে টিএইচসি সামান্য উপকার দিয়েছে, সেখানেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব, বমি বমি ভাবের মতো সমস্যা মাঝারি থেকে গুরুতর মাত্রায় দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যেহেতু অধিকাংশ গবেষণাই স্বল্পমেয়াদি, তাই দীর্ঘদিন ক্যানাবিস ব্যবহারে শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর কী প্রভাব পড়ে, সে বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান এখনো অধরা।

অ্যানালস অফ ইন্টারনাল মেডিসিন -এ প্রকাশিত এই গবেষণা সংশ্লিষ্ট সম্পাদকীয় মন্তব্যে বিশেষজ্ঞরা তাই সাবধান করে দিয়েছেন, ক্যানাবিস দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার কোনো জাদুকরি সমাধান নয়। সীমিত স্বস্তির বিনিময়ে ঝুঁকি নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত, তা ভেবে দেখা জরুরি। তাঁদের মতে, রোগী, চিকিৎসক ও নীতিনির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা অপরিহার্য।

এই গবেষণার মূল বক্তব্যটি খুবই পরিষ্কার। গবেষকরা কোনো রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব না রেখেই বলেছেন,দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার লড়াইয়ে ক্যানাবিস হয়তো সহায়ক উপকরণ হতে পারে,তবে চূড়ান্ত অস্ত্র নয়। এই গবেষণাটিকে নিয়ে বিজ্ঞানের পথচলা যত দীর্ঘ হবে, ততই হয়তো স্পষ্ট হবে এই আশার গল্প শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে।

 

 

সূত্রঃ Cannabis-Based Products for Chronic Pain by Roger Chou, Rongwei Fu, et.al; Annals of Internal Medicine, 30th December 2025.

DOI: 10.7326/ANNALS-25-03152.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − 3 =