ব্রোঞ্জ যুগের বস্ত্রবিপ্লব

ব্রোঞ্জ যুগের বস্ত্রবিপ্লব

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ এপ্রিল, ২০২৬

মানুষের পোশাক কেবল তার পরিচয়ের অংশ নয়। হাজার হাজার বছর ধরে পোশাক-ই ঠান্ডা, গরম থেকে আমাদের রক্ষা করে গেছে। কিন্তু ব্রোঞ্জ যুগের মানুষ কীভাবে কাপড় তৈরি করত? এ বিষয়ে স্পেনের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার নতুন আলোকপাত করেছে। সম্প্রতি দক্ষিণ স্পেনের কাবেথো রেদোন্দো প্রত্নস্থল থেকে খুঁজে পাওয়া একটি প্রাচীন তাঁতের অবশিষ্টাংশ নিয়ে গবেষণা করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। সন্ধানে জানা যায়, তাঁতটি প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ সালের । অর্থাৎ ব্রোঞ্জ যুগে এই অঞ্চল বস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই বিশেষ ধরনের তাঁতকে বলা হয় ‘warp-weighted loom’ । প্রাগৈতিহাসিক ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এই তাঁত ব্যবহার করে কাপড় ও কম্বল তৈরি করা হতো। এতে সুতোকে টানটান রাখার জন্য নীচে পাথর বা মাটির তৈরি ওজন ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। এই তাঁতের মূল কাঠামো কাঠ ও উদ্ভিজ্জ তন্তু দিয়ে তৈরি, যা সাধারণত তৈরি হওয়ার সময়ই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এতদিন প্রত্নতাত্ত্বিকরা মূলত এই পাথর বা মাটির ওজনের উপর নির্ভর করেই প্রাচীন বস্ত্র তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পেতেন। সহ গবেষক রিকার্দো এ. বাসো রিয়াল জানান, ব্রোঞ্জ যুগে দক্ষিণ-পূর্ব আইবেরিয়া অঞ্চলে বস্ত্র উৎপাদনের প্রমাণ আগে থেকেই ছিল। কিন্তু তাঁতযন্ত্রের কাঠামোর অংশ খুব কমই সংরক্ষিত থাকে, ফলে পুরো তাঁতযন্ত্রের গঠন ও ব্যবহার পদ্ধতি বোঝা কঠিন ছিল। কাবেথো রেদোন্দো-তে গবেষক দলটি মাটির ওজনের কাছাকাছি পোড়া কাঠের টুকরো এবং উদ্ভিজ্জ তন্তুর দড়ি খুঁজে পান। তাদের মতে, এগুলোই সম্ভবত এখনও পর্যন্ত পাওয়া প্রাচীনতম কাঠের তাঁতের অবশিষ্টাংশগুলোর একটি। এই আবিষ্কারটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ব্রোঞ্জ যুগের তাঁত প্রযুক্তির অন্যতম সুসংরক্ষিত নিদর্শন। সংরক্ষিত কাঠ ও মাটির ওজন বিশ্লেষণ করে গবেষকরা আংশিকভাবে এই তাঁতটি পুনর্নির্মাণ করেছেন। তাতে দেখা গেছে, তাঁত তৈরি হয়েছিল আলেপ্পো পাইন গাছের কাঠ দিয়ে, যা ঐ অঞ্চলের স্থানীয় প্রজাতি। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হল তাঁতের ওজনগুলো। যেগুলোর আকার ও বৈশিষ্ট্য থেকে বোঝা যায়, এগুলো দিয়ে খানিকটা সূক্ষ্ম ও জটিল বস্ত্র বোনা সম্ভব ছিল। এই তাঁত শুধু সাধারণ সোজা বুননের কাপড়ই নয়, আরও ঘন ও জটিল নকশার কাপড় তৈরিতে সক্ষম ছিল। এমনকি হয়তো প্রাথমিক তির্যক নকশার বুননও এতে সম্ভব ছিল। এই তথ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তির্যক নকশার বুনন সাধারণত খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালের আগে খুব বেশি প্রচলিত ছিল না। প্রাগৈতিহাসিক সময়ে বেশিরভাগ কাপড় তৈরি হতো উদ্ভিজ্জ তন্তু, যেমন শণ থেকে। কিন্তু তির্যক বুনন সাধারণত হত পশম দিয়ে। হয়তো কাবেথো রেদোন্দো সেই সময়ের “বস্ত্র বিপ্লবের”-এর এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। এর মাধ্যমে ব্রোঞ্জ যুগের মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কারুশিল্প সম্পর্কে একটি বিরল ও বাস্তবসম্মত ধারণা পাওয়া যায়। প্রাচীন মানুষ কেবল বেঁচে থাকার জন্যই নয়, বরং দক্ষতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি গড়ে তুলেছিল, যা আজও আমাদের বিস্মিত করে।

 

সূত্রঃ্: Popular Science; March; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 − 6 =