ভণ্ডত্ববোধ জনিত ভয়

ভণ্ডত্ববোধ জনিত ভয়

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬

শিক্ষাজীবনে ধারাবাহিক চমৎকার ফলাফল, মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তি, প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান—সব কিছু থাকা সত্ত্বেও ভেতরে ভেতরে নিজেকে কেমন যেন প্রতারক মনে করা। মনের মধ্যে চলতে থাকে : আমি এখানে থাকার যোগ্য নই, একদিন সবাই বুঝে যাবে আমি আসলে কিছুই জানি না। এই অদৃশ্য ভয়কেই মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ইমপোস্টারিজম/ ভণ্ডত্ববোধ। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত পড়ুয়া নারীদের ক্ষেত্রে এই অনুভূতি প্রায় সর্বত্রব্যাপী প্রবল।

বিংহ্যামটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী জিয়ুন এলিজাবেথ শিন-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়ুয়া নারীদের ৯৭.৫ শতাংশ অন্তত মাঝারি মাত্রার প্রতারণার অনুভূতির কথা স্বীকার করেছেন। অর্থাৎ, প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময় নিজেকে ‘ভুয়া সাফল্যের অধিকারী’ বলে ভাবেন। বিশেষ করে যারা একাধিক প্রান্তিক পরিচয়ের অধিকারী, যেমন- অশ্বেত সংখ্যালঘু নারীরা। তাদের ক্ষেত্রে এই অনুভূতি আরও তীব্র হতে পারে।

ভালো ফল, পুরস্কার বা গবেষণার স্বীকৃতি—সবই মনে হয় নিছক ভাগ্য, সময়ের কাকতালীয় সহায়তা, কিংবা অন্যের দয়ার দান। নিজের মেধা ও পরিশ্রম সেখানে অনুপস্থিত। ফলে প্রতিটি অর্জনের পরেও জন্ম নেয় নতুন ভয়—আগামীবার হয়তো আর পারব না। এই ভণ্ডত্ববোধ কিন্তু সাধারণ আত্মসম্মানহীনতা বা বিষণ্নতা নয়। বরং এটি এমন এক মানসিক প্রবণতা, যেখানে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নিজের যোগ্যতা,সাফল্য নিজের চোখে মূল্যহীন বলে মনে হয় । ভালো ফল বা সাফল্যকে ব্যক্তিগত দক্ষতার ফল হিসেবে না দেখে, ভাগ্য, সময়ের আনুকূল্য বা অন্যের সাহায্যের ফল বলে মনে হয়। ফলে বারবার মনে হয়—পরের বার হয়তো ভাগ্য সাথ দেবে না, আর তখনই নিজের ব্যর্থতা ধরা পড়ে যাবে।

এইসব ক্ষেত্রে পড়ুয়া নারীদের নিয়ে দীর্ঘদিনের সামাজিক বাঁধাধরা ধারণা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা, কম প্রতিনিধিত্ব, এবং ধারাবাহিক সন্দেহের আবহ নারীদের কোনো কিছুকে নিজস্ব অর্জন বলে বিশ্বাস করতে বাধা দেয়। এই মানসিক চাপের প্রভাব শুধু অনুভূতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ভণ্ডত্ববোধের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, অতিরিক্ত অবসাদ এবং পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা গভীরভাবে যুক্ত।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বদ্ধ মনোভাব —অর্থাৎ এই বিশ্বাস যে বুদ্ধিমত্তা ও ক্ষমতা জন্মগত ও অপরিবর্তনীয়। যারা এমনভাবে ভাবেন, তারা সামান্য ব্যর্থতাকেও নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখেন। বিপরীতে, শেখা ও উন্নতির ধারণাকে গুরুত্ব দিলে প্রতারণার অনুভূতি কমতে পারে।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরী বিষয় হল মুখ বুঝে না থেকে এই অনুভূতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলা। নীরবতা ভয় বাড়ায়। অপরদিকে সহায়ক পরিবেশ, সহমর্মী আলোচনা এবং সামাজিক সমর্থন ভণ্ডত্ববোধের চক্র ভাঙতে পারে। সাফল্যকে স্বীকার করতে শেখা—এটাই হয়তো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত পড়ুয়া মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার পথে সবচেয়ে জরুরি মানসিক পদক্ষেপ।

 

সূত্রঃ: Impostorism: prevalence and its relationships with mental health, burnout, dropout consideration, and achievement among graduate women in STEM. Materials provided by Binghamton University, 5th January 2026. DOI: 10.1007/s11218-025-10090-0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten − 4 =