ধাপে ধাপে হিসাব কষে এগোনোই হল ক্লাসিক্যাল বা সাবেকি কম্পিউটিংয়ের ধর্ম। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতের নিয়ম আলাদা। সেখানে সমস্যা সমাধান মানে একটার পর একটা দরজা খোলা নয় – একই সঙ্গে বহু দরজায় ঢুঁ দেওয়া। কোয়ান্টাম পদ্ধতি একই সময়ে অসংখ্য সম্ভাবনা নিয়ে অনুসন্ধান করতে পারে। তাই তার গতি কিছু নির্দিষ্ট কাজে, আজকের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারকেও হার মানাতে পারে। এই ক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারলে কম্পিউটিং, যোগাযোগ ব্যবস্থা আর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মানচিত্রটাই বদলে যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবের বাধা একটাই : এই সম্ভাবনা এখনও মূলত পরীক্ষাগারের চার দেওয়ালের ভিতর বন্দি। বিচ্ছিন্ন কোয়ান্টাম ডিভাইস দিয়ে তো বিপ্লব হয় না। বিপ্লব আসে সংযোগ থেকে। ঠিক যেমন ইন্টারনেট আলাদা আলাদা কম্পিউটারকে জুড়ে দিয়ে বিশ্বটাকে বদলে দিয়েছিল, তেমনই ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম লাফ নির্ভর করছে কোয়ান্টাম প্রসেসরগুলোকে ‘নেটওয়ার্ক’-এ বেঁধে ফেলার উপর। আর সেখান থেকেই জন্ম নিচ্ছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প : ‘বিস্তারিত ও সুরক্ষিত কোয়ান্টাম কম্পিউটেশন’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের লক্ষ্য স্পষ্ট- একটি কোয়ান্টাম ইন্টারনেটের ভিত্তি তৈরি করা। খুবই কঠিন এই কাজ। হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে আয়ন-ট্র্যাপ নোড, অর্থাৎ ফাঁদে আটকানো পরমাণুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অতি সূক্ষ্ম কোয়ান্টাম প্রসেসর আর আলোকণার সংযুক্তি। সেখানে আলোর একক কণা দিয়ে এই প্রসেসরগুলোকে নিরাপদভাবে যুক্ত করা হবে। হার্ডওয়্যার আর গোপনীয়তা-রক্ষাকারী প্রোটোকলের এই মেলবন্ধন ভবিষ্যতে একদিকে যেমন অতি-নিরাপদ যোগাযোগকে সম্ভব করে তুলবে, অন্যদিকে তেমনই ত্বরান্বিত করবে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। পাঁচ বছর ধরে চলবে এই প্রকল্প, ডিসেম্বর ২০৩০ পর্যন্ত। নেতৃত্বে রয়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ডেভিড লুকাস এবং জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিও মুরাও। অধ্যাপক লুকাসের ভাষায়, “ ইন্টারনেট যেমন ক্লাসিক্যাল বা সাবেকি কম্পিউটারদের যুক্ত করে, তেমনই কোয়ান্টাম ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কোয়ান্টাম প্রসেসর নেটওয়ার্কের ওপর। কিন্তু এই নেটওয়ার্ককে সুবিস্তৃত, নিরাপদ, যাচাইযোগ্য আর বাস্তব ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করা, এ এক গভীর বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। এর মোকাবিলা করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া উপায় নেই।“ এই সহযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে কোয়ান্টাম প্রযুক্তির দৌড়ে বিশ্বের প্রথম সারিতে থাকা দুই দেশ যুক্তরাজ্য ও জাপান। অক্সফোর্ডের দল ইতিমধ্যেই আয়ন-ট্র্যাপ ভিত্তিক কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কিংয়ে পথপ্রদর্শক। তাছাড়াও আছে কোয়ান্টাম যাচাই এবং আয়ন-ফোটন পারস্পরিক সংযোগের দক্ষতা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে জাপানের গবেষকরা নিয়ে আসছেন কোয়ান্টাম যোগাযোগ তত্ত্ব, উন্নত আয়ন-ট্র্যাপ হার্ডওয়্যার আর অত্যাধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা। এসবই গড়ে উঠেছে তাদের জাতীয় কোয়ান্টাম টেকনোলজি ইনোভেশন স্ট্র্যাটেজি ও ‘এসপায়ার’ প্রোগ্রামের ছায়ায়। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য কেবল একটি যন্ত্র বানানো নয়, আস্ত এক সুসংহত নির্মাণ নকশা তৈরি করা। সেখানে একসঙ্গে নিরাপদ কোয়ান্টাম কম্পিউটেশনের প্রতিটি স্তরের নকশা তৈরি করা হবে। হার্ডওয়্যার থেকে শুরু করে সফটওয়্যার, এমনকি ব্যবহারকারীর অ্যাপ্লিকেশন পর্যন্ত, সবকিছুই ‘ফুল-স্ট্যাক কো-ডিজাইন’ পদ্ধতিতে এক সুতোয় গাঁথা হবে। যাতে পুরো সিস্টেমটি একটি সঙ্গতিপূর্ণ শরীরের মতো কাজ করে। এই স্থাপত্যের পরীক্ষা হবে ফেডারেটেড কোয়ান্টাম মেশিন লার্নিং দিয়ে। এটি একটি কৌশল যেখানে বিকেন্দ্রীভূত তথ্যের উপর এ আই মডেল যৌথভাবে প্রশিক্ষিত হয়, অথচ তথ্যের গোপনীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যারের জন্য সফটওয়্যার কাঠামো প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। অক্সফোর্ড ছাড়াও যুক্তরাজ্যের এই অভিযানে রয়েছে এডিনবরা, ম্যানচেস্টার ও সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়। সব মিলিয়ে, এ শুধু এক গবেষণা প্রকল্প নয়, এটি কোয়ান্টাম যুগের নেটওয়ার্কে যুক্ত ভবিষ্যতের জন্য এক রিহার্সাল। আজ যা পরীক্ষাগারে জন্ম নিচ্ছে, আগামী দশকে সেটাই হয়ে উঠতে পারে বিশ্ব জোড়া কোয়ান্টাম পরিকাঠামোর মেরুদণ্ড।
সূত্র: University of Oxford ; Feb, 2026
