ভূকেন্দ্রে ভূ-স্বর্ণ 

ভূকেন্দ্রে ভূ-স্বর্ণ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২ মার্চ, ২০২৬

পৃথিবীর কেন্দ্র একটি অত্যন্ত ঘন ও উত্তপ্ত ধাতব বল, যার ভেতরে প্লাটিনাম, রুথেনিয়াম এবং সোনাসহ বহু মূল্যবান ধাতুর মিশ্রণ রয়েছে। শুনতে আকর্ষণীয় মনে হলেও, এই প্রাকৃতিক ধনভাণ্ডারে মানুষের পৌঁছানো কার্যত অসম্ভব। কারণ, এটি প্রায় ১,৮৫০ মাইল (প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার) পুরু কঠিন শিলাস্তরের নীচে চাপা পড়ে আছে। তবে সাম্প্রতিক এক আবিষ্কার জানাচ্ছে, সেই গভীর স্তর থেকে অতি সামান্য পরিমাণ মূল্যবান ধাতু ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে আসছে, বিশেষ করে হাওয়াইয়ের আগ্নেয়গিরিগুলোর মাধ্যমে। জার্মানির গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-রসায়নবিদ নিলস মেসলিং এক বিবৃতিতে বলেছেন, “প্রথম ফলাফল আসার পর আমরা বুঝতে পারি, আমরা সত্যিই সোনা খুঁজে পেয়েছি। আমাদের তথ্য বলছে যে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে, সোনাসহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতু ম্যান্টলে প্রবেশ করছে।“ গবেষকেরা হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত আগ্নেয় শিলার নমুনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রুথেনিয়াম নামের একটি মূল্যবান ধাতুর অতি সামান্য উপস্থিতি শনাক্ত করেন। তাঁরা রুথেনিয়ামের একটি বিশেষ আইসোটোপ ¹⁰⁰Ru খুঁজে পান। এখানে “অপ্রত্যাশিত” শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ¹⁰⁰Ru ভূ-ত্বক ও ভূ-মজ্জার মধ্যবর্তী ম্যান্টলেও থাকে, তবে এর পরিমাণ কেন্দ্রে তুলনামূলকভাবে বেশি। পৃথিবীর মোট সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর প্রায় ৯৯.৯৯৯ শতাংশ কেন্দ্রে জমা রয়েছে। প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর আগে যখন পৃথিবী গঠিত হয়েছিল, তখন ভারী ধাতুগুলি নীচের দিকে ডুবে গিয়ে কেন্দ্রে জমা হয়। কেন্দ্রে থাকা রুথেনিয়ামের উৎস ম্যান্টলে থাকা রুথেনিয়ামের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। এ পার্থক্য এত সূক্ষ্ম যে এতদিন ভূ-তাত্ত্বিক যন্ত্র দিয়ে তা আলাদা করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি গবেষকেরা এক নতুন আইসোটোপ বিশ্লেষণ পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে এই সূক্ষ্ম পার্থক্য শনাক্ত করা গেছে। এতে দেখা যায়, হাওয়াইয়ের কিছু আগ্নেয় শিলায় ¹⁰⁰Ru–এর মাত্রা অস্বাভাবিক বেশি। এর অর্থ, এই রুথেনিয়াম সম্ভবত কোর-ম্যান্টল সীমানা অঞ্চল থেকে উঠে এসেছে। অর্থাৎ, পৃথিবীর গভীরতম স্তর থেকে পদার্থ উপরের দিকে উঠে আসছে। এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতদিন মনে করা হতো পৃথিবীর কেব্দ্র কার্যত বিচ্ছিন্ন ও অপ্রবেশযোগ্য। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে কেন্দ্রের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে অল্প পরিমাণ পদার্থ উপরের স্তরে পৌঁছাতে পারে। গবেষকেরা আরও জানান, কোর-ম্যান্টল সীমানা থেকে বিপুল পরিমাণ অতিউত্তপ্ত শিলা উপরের দিকে উঠে আসে। যার পরিমাণ কয়েকশ কোয়াড্রিলিয়ন (১০^১৫) মেট্রিক টন হতে পারে। এই শিলাই শেষ পর্যন্ত হাওয়াইয়ের মতো সমুদ্রের আগ্নেয় দ্বীপ তৈরি করে। তবে এর মানে এই নয় যে, মানুষ কেন্দ্রের সোনা আহরণ করতে পারবে। উপরে উঠে আসা ধাতুর পরিমাণ নিতান্ত সামান্য, শুধু বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত করার মতো। অর্থনৈতিকভাবে তা সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তবু গবেষণাটি পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন ও গতিবিধি সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে। এটি দেখাচ্ছে, পৃথিবীর গভীরে পদার্থের ধীর কিন্তু সক্রিয় প্রবাহ চলছে। এই প্রক্রিয়া অনুধাবন করা গেলে গ্রহের তাপীয় বিবর্তন, আগ্নেয়গিরির উৎপত্তি এবং ভূ-গঠনের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা স্পষ্টতর হবে।

 

সূত্র: Popular Science, May 22, 2025

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + 13 =