মদ না খেয়েই মাতাল

মদ না খেয়েই মাতাল

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬

আমরা কি কখনো ভাবতে পেরেছিলাম যে, বিন্দুমাত্র অ্যালকোহল না ছুঁয়েও কেউ মাতাল হয়ে পড়তে পারেন? হ্যাঁ শুনতে অবাক লাগলেও এমনই এক বিরল ও রহস্যময় রোগ নিয়ে বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে পরিষ্কার ধারণার দিকে এগোচ্ছেন। এই রোগের নাম অটো-ব্রিউয়ারি সিনড্রোম (এ বি এস)। এই রোগে আক্রান্ত মানুষের শরীর নিজেই অ্যালকোহল তৈরি করে, যার ফলে কোনো মদ্যপান ছাড়াই রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

এবিএস-এ মূল ভূমিকা পালন করে আমাদের অন্ত্র-নিবাসী অণুজীবরা। সাধারণত অন্ত্রের জীবাণুগুলো শর্করা ভেঙে খুব সামান্য পরিমাণ ইথানল তৈরি করে, যা শরীরে কোনো প্রভাব ফেলে না। কিন্তু এবিএস-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীব অতিরিক্ত শর্করা ভেঙে এত বেশি ইথানল তৈরি করে যে তা রক্তে পৌঁছে মানুষকে আর পাঁচটা সত্যিকারের মাতালের মতো টলমল অবস্থায় নিয়ে যায়। ইথানলই বিয়ার, ওয়াইন বা মদের প্রধান উপাদান।

এই রোগের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো এর সামাজিক মূল্য। বিশ্বজুড়ে এরকম একশোটিরও কম ঘটনা নথিভুক্ত হলেও গবেষকদের ধারণা, এ বি এস ব্যাপকভাবে অবমূল্যায়িত ও ভুলভাবে নির্ণীত। কারণ বাইরে থেকে লক্ষণগুলো তো মদ্যপানের মতোই। ফলে অনেক রোগীকেই গোপনে মদ্যপায়ী বলে দোষারোপ করা হয়। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক অশান্তি এমনকি আইনি জটিলতাও দেখা দেয়। এ রোগ নির্ণয়ও কঠিন। দীর্ঘ সময় নজরদারিতে রেখে রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা মাপতে হয়, যা ব্যয়বহুল এবং সব জায়গায় ব্যবস্থা সহজলভ্যও নয়।

এই অবস্থার ফলে স্মৃতিভ্রংশ, চিন্তাশক্তি হ্রাস, লিভারের ক্ষতি এবং অ্যালকোহল প্রত্যাহারজনিত উপসর্গও দেখা দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করছেন, অন্ত্রের জীবাণুদের ভারসাম্য নষ্ট হওয়াই এর মূল কারণ। বিশেষ করে ই কোলাই ও ক্লেবসিয়েলা নিউমোনির মতো ব্যাকটেরিয়া শর্করা থেকে অ্যালকোহল তৈরি করতে সক্ষম। আগে মনে করা হতো এ ব্যাপারে ছত্রাকের ভূমিকা বেশি, কিন্তু নতুন গবেষণায় ব্যাকটেরিয়ার দিকেই বেশি ইঙ্গিত মিলছে।

২০২৬ সালে নেচার বায়োলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে ২২ জন এ বি এস রোগী, তাঁদের পরিবারের ২১ জন সদস্য এবং ২২ জন সুস্থ মানুষের অন্ত্রের জীবাণু বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়। দেখা যায়, রোগের তীব্র অবস্থায় এ বি এস রোগীদের মল ও রক্তে ইথানলের মাত্রা অন্যদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে সহজ মল পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ শনাক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ফলে চিকিৎসা আরও মানবিক ও সহজলভ্য হয়ে উঠতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অ্যালকোহল তৈরির সঙ্গে জড়িত বিশেষ উৎসেচকের মাত্রা বেড়ে যায়। তাই নির্দিষ্ট জীবাণুদের ধ্বংস করার বদলে এই উৎসেচকগুলোকেই নিশানা করে চিকিৎসা করলে ফল ভালো হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, একজন রোগীর অন্ত্রে সুস্থ ব্যক্তির অন্ত্রের মল জীবাণু প্রতিস্থাপন করার পর টানা ১৬ মাস কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি। এই সাফল্য প্রমাণ করেছে, সব মাতলামি চরিত্রের দোষ নয়; কখনো কখনো তা শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অণুজীবদের খামখেয়ালীও হতে পারে।

সূত্র : It’s possible to become intoxicated… – Nautilus Magazine | Facebook.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven − three =