মমি সংরক্ষণের বিবর্তিত কৌশল 

মমি সংরক্ষণের বিবর্তিত কৌশল 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ মার্চ, ২০২৬

প্রাচীন মিশরের মমি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের কৌতূহল ও বিস্ময়ের কেন্দ্রবিন্দু। এই মমি মিশরীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীন মিশরের কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তি বা ফ্যারাওরা মারা গেলে তাদের মৃতদেহকে শুকিয়ে তার ওপর রাসায়নিক প্রলেপ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখা হত। সহজকথায় বলতে গেলে মমি হল রাসায়নিকের সাহায্যে মৃতদেহ সংরক্ষণের একটা বিশেষ পদ্ধতি। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখিয়েছে, এই মমিগুলোর চারপাশে ভেসে থাকা মৃদু গন্ধের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে হাজার বছর আগে মিশরীয়রা কিভাবে কোন রাসায়নিক ব্যবহার করে এই সংরক্ষণটা করতো তার স্পষ্ট ঝলক। ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সেই গন্ধের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে মমিফিকেশন/মমি তৈরির পদ্ধতির বিবর্তন সম্পর্কে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অফ আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স–এ।

গবেষকদের মতে, মমির গন্ধ শুধুমাত্র সময়ের প্রভাবে তৈরি হওয়া কোনো সাধারণ দুর্গন্ধ নয়। এটি হল মমি সংরক্ষণের সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ, তেল, রজন এবং কাপড়ের সংমিশ্রণে তৈরি এক বিশেষ গন্ধ। এই গন্ধের রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় প্রাচীন মিশরীয়রা কীভাবে যুগে যুগে তাদের মৃতদেহ সংরক্ষণের কৌশল উন্নত করেছিল।

এই গবেষণার একটি বিশেষ দিক হলো এর অক্ষত পদ্ধতি। সাধারণত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় নমুনাকে দ্রাবকের সাহায্যে ভেঙে রাসায়নিক বিশ্লেষণ করা হয়, যা প্রাচীন নিদর্শনের ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা মমির একেবারে ছোট গোলমরিচের দানার মতো একটি নমুনার চারপাশের বাতাস সংগ্রহ করে সেই বাতাসে থাকা রাসায়নিক গ্যাস বিশ্লেষণ করেন। এই গ্যাসগুলিকে বলা হয় ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ডস/উদ্বায়ী জৈব যৌগ। এগুলি সহজেই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাচীন উপাদানের রাসায়নিক স্বাক্ষর বহন করে।

গবেষকেরা মোট ১৯টি মমি থেকে সংগৃহীত ৩৫টি সুগন্ধি নির্যাস ও ব্যান্ডেজের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। এই মমিগুলোর সময়কাল প্রায় ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩৯৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী । অর্থাৎ, মমিগুলো দুই হাজার বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাসকে ধারণ করে। মমির রসায়নিক বিশ্লেষণে তারা মোট ৮১ ধরনের উদ্বায়ী জৈব যৌগ শনাক্ত করেন, যা মমি তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতি নির্দেশ করে। এই রাসায়নিক যৌগগুলোকে চারটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। চর্বি ও তেল থেকে তৈরি হয় সুগন্ধি যৌগ ও স্বল্প-শৃঙ্খল ফ্যাটি অ্যাসিড। মোম থেকে পাওয়া যায় বিশেষ ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড ও সিনামিক যৌগ। উদ্ভিজ্জ রজন থেকে নির্গত হয় সুগন্ধি অণু ও সেস্কুইটারপেনয়েড, আর বিটুমিন থেকে উৎপন্ন হয় ন্যাফথেনিক যৌগ।

এই ফলাফলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা ফুটে উঠেছে। দেখা গেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মমি তৈরির পদ্ধতি আরও জটিল ও উন্নত হয়েছে। প্রাচীন সময়ের মমিতে প্রধানত তেল ও চর্বির ব্যবহার দেখা যায়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে মমিতে আমদানি করা দামি রজন ও বিটুমিন ব্যবহার করা শুরু হয়। এ থেকে বোঝা যায় যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মমি তৈরির পদ্ধতি আরও উন্নত, ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে পরিশীলিত হয়ে উঠেছিল। এছাড়াও গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, মমির শরীরের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ধরনের রাসায়নিক চিহ্ন পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, মাথার অংশে ব্যবহৃত উপাদানের রাসায়নিক সংরক্ষক শরীরের অন্যান্য অংশের থেকে আলাদা হতে পারে। সম্ভবত সংরক্ষণকে আরও দীর্ঘদিন কার্যকর রাখার জন্য শব সংরক্ষকরা শরীরের ভিন্ন ভিন্ন অংশে আলাদা আলাদা রাসায়নিক মিশ্রণ ব্যবহার করতেন।

মমি সংরক্ষণের এহেন নতুন পদ্ধতি পরবর্তীতে শুধুমাত্র মমি নিয়ে গবেষণায় নয়, সংগ্রহশালার অন্যান্য উপাদান সংরক্ষণ কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ বাতাসের রাসায়নিক বিশ্লেষণ দ্রুত এবং অক্ষত উপায়ে প্রাচীন নিদর্শনের তথ্য সংগ্রহ করতে সাহায্য করে। ফলে ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত মমিগুলোর ওপর গবেষণা আরও সহজ ও নিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।

 

সূত্র: “Volatile compounds reveal the composition of embalming materials used in Egyptian mummification” by Wanyue Zhao, Katherine A. et.al; 22nd January 2026, published in Journal of Archaeological Science. DOI: 10.1016/j.jas.2026.106490

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × five =