মস্তিষ্ক সীমান্তে সজীব প্রহরা 

মস্তিষ্ক সীমান্তে সজীব প্রহরা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১ মার্চ, ২০২৬

মস্তিষ্ক মানবদেহের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও মূল্যবান অঙ্গ। শক্ত খুলি ও ত্রিস্তর সুরক্ষা আবরণ (মেনিনজেস) তাকে আঘাত ও জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে, এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই লুকিয়ে আছে আরও এক বিস্ময়কর সক্রিয় সুরক্ষা–প্রক্রিয়া। খুলির গায়ে আছে বৃহৎ শিরাজাল, যাদের বলা হয় ভেনাস সাইনাস। এতদিন এগুলোকে কেবল তরল নিষ্কাশনের নিষ্ক্রিয় নালি বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তারা শুধুমাত্র মস্তিষ্কের নিকাশি ব্যবস্থা নয়, এক গতিশীল প্রহরী।

এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে নেচার পত্রিকায়। ইঁদুর ও মানুষের ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই ভেনাস সাইনাস রক্ত ও সেরিব্রোস্পাইনাল রস পাম্প করার মতো স্পন্দিত হতে পারে। সেরিব্রোস্পাইনাল রস মস্তিষ্ক আর মেরুদণ্ড -রজ্জুর মধ্যে চলাচল করে। আগে ধারণা ছিল, এগুলো নিছক নিষ্কাশন–নালি, কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে এগুলো জীবন্ত ও সাড়া দানে সক্ষম কাঠামো।

গবেষকেরা “ইনট্রাভাইটাল ইমেজিং” নামক এক বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। জীবিত, অচেতন ইঁদুরের খুলির অতি ক্ষুদ্র অংশ পাতলা করে লেজারের সাহায্যে নীচের অংশ আলোকিত করা হয়। প্রভমান প্রোটিন দিয়ে চিহ্নিত প্রতিরক্ষা কোষগুলোকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। এতে দেখা যায়, মসৃণ পেশি–আবৃত শিরাগুলো সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে তরল নিষ্কাশনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, শিরার প্রাচীর গঠনকারী এন্ডোথেলিয়াল কোষগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র বা “ফেনেস্ট্রেশন” রয়েছে, যার ব্যাস প্রায় এক মাইক্রোমিটারের কাছাকাছি হতে পারে। এই ক্ষুদ্র পথ দিয়ে তরল, অণু , এমনকি অণুজীবও চলাচল করতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত আচরণটি এই যে, প্রতিরক্ষা কোষ যখন টহল দিতে দিতে শিরার দেয়ালের কাছে চলে আসে, তখন শিরার কোষগুলো নিজেদের সংযোগস্থল সাময়িকভাবে খুলে বা সরিয়ে তাদের জায়গা করে দেয়। গবেষকেরা এই প্রক্রিয়াকে বলেছেন “রাফলিং”।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউরোইমিউনোলজিস্ট ডোরিয়ান ম্যাকগাভার্নের মতে, তিনি দুই দশকের বেশি সময় ধরে রক্তনালির ওপর গবেষণা করছেন, কিন্তু এমন আচরণ আগে কখনও দেখেননি। সংযোগস্থল এইভাবে ক্রমাগত খোলা–বন্ধ হওয়া থেকে বোঝা যায় যে, মস্তিষ্কের সীমানাটি কেবল স্থির আবরণ নয়, তা আসলে এক অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও সক্রিয় সংযোগ-তল।

খুলির ভেতরে সামান্য প্রদাহ, অতিরিক্ত তরল বা চাপ বৃদ্ধি দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ভেনাস সাইনাস সক্রিয়ভাবে সাড়া দিয়ে তরল নিষ্কাশন বাড়াতে পারে। প্রতিরক্ষা কোষের চলাচল সহজ করে দিয়ে তা মস্তিষ্ককে রক্ষা করতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের এই “খুলি নালা” কেবল বর্জ্য অপসারণের নালি নয়, এ এক সচেতন, সজাগ প্রহরী, যা নিরবচ্ছিন্নভাবে স্পন্দিত হয়ে মস্তিষ্ককে নিরাপদ রাখে।

 

 

সূত্র: How ‘skull drains’ keep the brain safe from damage and pathogens By Felicity Nelson, 18th February 2026.

doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-00518-8

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 + three =