মহাকাশের নিয়ন্তা কে?

মহাকাশের নিয়ন্তা কে?

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ এপ্রিল, ২০২৬

পয়লা এপ্রিল চারজন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চাঁদের উদ্দেশে রওনা দিলেন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরে আবারও এই চাঁদে মানবযাত্রা। দশ দিনের এই মিশন ঘিরে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা, গর্ব আর ‘ঐতিহাসিক’ শব্দের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায় আলোচনার বাইরেই থেকেছে। মহাকাশে আমাদের দায়িত্বশীলতা বা “সুপরিচালনা’’। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে অ্যাপোলো অভিযানের সময় মহাকাশচারীরা চাঁদের মাটিতে ৯৬টি ব্যাগ ফেলে রেখে আসেন, যাতে ছিল মানববর্জ্য- মূত্র, মল ও বমি। ওজন কমানোর জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যাতে চাঁদ থেকে ফেরার সময় বেশি পরিমাণে শিলা নমুনা আনা যায়। এমনকি নিল আর্মস্ট্রং চাঁদে পা রাখার পর যে প্রথম ছবি তোলেন, তাতেও এমন একখানা বর্জ্যের ব্যাগ ধরা পড়ে। বর্তমানে অ্যাস্ট্রো-বায়োলজিস্টরা এই বর্জ্য সংগ্রহ করে ফেরত আনার কথা ভাবছেন। কারণ, এতে চাঁদের পরিবেশে জৈব দূষণের সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বর্জ্য চাঁদে ফেলে রাখা যে উচিত কাজ, সেই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল ? ১৯৬৭ সালের দূর মহাকাশ চুক্তি মহাকাশে মানুষের কার্যকলাপের মূল আইনি কাঠামো হিসেবে কাজ করে। তারই নিয়মানুসারে কোনো দেশ কোনো মহাজাগতিক বস্তুর মালিকানা দাবি করতে পারবে না। কিন্তু এতে পরিবেশ সংরক্ষণ বা দায়িত্বশীলতার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশ নেই। মহাকাশ পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, পৃথিবীর কক্ষপথও ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। পরিত্যক্ত উপগ্রহ, ভাঙা যন্ত্রাংশ ও মহাকাশ আবর্জনা ক্রমেই জমছে। ফলত ভবিষ্যতের মহাকাশযাত্রা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আমরা অনেকটা পৃথিবীর সমুদ্র বা বনভূমির মতোই মহাকাশকেও ‘অসীম সম্পদ’ ভেবে ব্যবহার করছি, যার পরিণতি হতে পারে গুরুতর। এই প্রেক্ষাপটে আর্টেমিস প্রকল্প কেবল চাঁদে ফেরা নয়, বরং আরও বড় পরিকল্পনার অংশ। নাসা এবং তার আন্তর্জাতিক অংশীদাররা স্থায়ী চাঁদে ঘাঁটি গড়া, খনিজ সম্পদ আহরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের পরিকল্পনা করছে। এমনকি ভবিষ্যতে মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার জন্য চাঁদকে লঞ্চপ্যাড হিসেবে ব্যবহার করার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু এই পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে চাঁদের পরিবেশ রক্ষা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা নেই। চাঁদ এক অনন্য বৈজ্ঞানিক সম্পদ। এর প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক গঠন সৌরজগতের ইতিহাস জানার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। বিশেষ করে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর গহ্বরগুলোতে জমে থাকা বরফ একদিকে যেমন প্রাচীন তথ্যভাণ্ডার, তেমনি ভবিষ্যৎ মিশনগুলোর জন্য সম্ভাব্য সম্পদ। কিন্তু একবার এই বরফ উত্তোলন বা সেটি দূষিত হলে তা আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। এছাড়া অ্যাপোলো অভিযানের অবতরণস্থলগুলো মানব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পৃথিবীতে যেমন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কাঠামো রয়েছে, তেমন কিছু চাঁদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে সেগুলির কিছুই নেই। অন্যদিকে আর্টেমিস অ্যাকর্ডস দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানালেও এটি বাধ্যতামূলক নয় এবং সব মহাকাশশক্তি এতে অংশ নেয়নি। মহাকাশ কোনো একক দেশের সম্পত্তি নয়। চাঁদ বা পৃথিবীর কক্ষপথ সেই দেশ বা সংস্থার নয়, যারা সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে বা হবে। এসবই মানবজাতির সম্মিলিত সম্পদ। অথচ বাস্তবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সীমিত কয়েকটি দেশ ও সংস্থা। যেখানে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের কোনো মতামত নেই। এখানেই সুপরিচালনার চিন্তাধারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক আদিবাসী সংস্কৃতিতে প্রকৃতিকে সম্পদ হিসেবে নয়, বরং সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়। তাকে সম্মান করতে হয়, রক্ষা করতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি মহাকাশ অনুসন্ধানেও প্রযোজ্য হতে পারে। অর্থাৎ, চাঁদকে নিছক কাজে লাগানোর বস্তু হিসেবে নয়, সংরক্ষণযোগ্য পরিবেশ হিসেবে ভাবা প্রয়োজন। এই ধারণা আদর্শবাদী মনে হলেও, এটি মানবসভ্যতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকেই উঠে এসেছে। পৃথিবীতে পরিবেশের ক্ষতি আমাদের দেখিয়েছে যে সীমাহীন শোষণের ফল কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই মহাকাশে যাওয়ার আগে আমাদের ঠিক করতে হবে, আমরা কি মালিকানা ও লাভের পথেই হাঁটব, নাকি দায়িত্বশীল রক্ষণাবেক্ষণের কথাও ভাববো?

সূত্র: Nature, April, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × two =