২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশ আগুনে ভরে গিয়েছিল। উজ্জ্বল আগুনের গোলা, তীব্র আলো আর শব্দতরঙ্গ- সব মিলিয়ে দৃশ্যটা ছিল বিপর্যয়ের মতো। আসলে এটা ছিল একটি নিষ্ক্রিয় চীনা মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণহীন পতন। বায়ুমণ্ডলে ঢুকে সেটি ভেঙে পড়ছিল। আর সেই মুহূর্তে, পৃথিবীর গভীরে বসানো ভূকম্প স্টেশনগুলো সেই পতনের শব্দ ধরছিল। নতুন এক গবেষণা জানাচ্ছে, এই ভূকম্প তথ্য ব্যবহার করেই বিজ্ঞানীরা পতনশীল মহাকাশ-ধ্বংসাবশেষের গতিপথ নির্ভুলভাবে নির্ণয় করতে পেরেছেন। গবেষকদের মতে, এই পদ্ধতি রেডার- ভিত্তিক পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য হতে পারে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে আকাশ থেকে কী পড়তে যাচ্ছে এবং কোথায় পড়তে পারে, তার আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারে ভূকম্পন মাপার যন্ত্র। ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলোর অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার জন ক্রাসিডিস বলছেন, “এই সেন্সরগুলো আগেই বসানো ছিল। সেগুলোকে এভাবে কাজে লাগানোর ভাবনাটা অসাধারণ”। গবেষণার প্রেক্ষাপটে রয়েছে এক বড় সমস্যা। পৃথিবীর কক্ষপথ ক্রমেই ভরে উঠছে মহাকাশ-জঞ্জালে। ২০১৫ সালে যেখানে অনুসন্ধান করা বস্তুর সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার, এখন তা বেড়ে ৪৩ হাজারের বেশি। এর বেশিরভাগই মৃত উপগ্রহ, পরিত্যক্ত রকেট ও সংঘর্ষে ভেঙে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ। বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে এদের অনেকগুলিই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে। ছোট জঞ্জাল পুড়ে যায়, কিন্তু বড় অংশ টিকে থাকতে পারে। তখনই ঝুঁকি তৈরি হয়। উড়োজাহাজের উড়ান পথ বদলাতে হয়, উড়ান দেরি করে, এমনকি বসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাতের আশঙ্কাও থাকে। কিছু ধ্বংসাবশেষে থাকে বিষাক্ত বা দাহ্য রকেট জ্বালানি। তবে পতনের স্থান নির্ভুলভাবে বলা কঠিন। কারণ উপরের বায়ুমণ্ডল তো স্থির নয়। সৌরঝড় ও সৌরশিখার প্রভাবে এর ঘনত্ব বদলে যায়, ফলে ধ্বংসাবশেষের গতি ও পথও বদলে যায়। এই অনিশ্চয়তাই ভাবিয়েছিল জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ভূকম্প বিশেষজ্ঞ বেঞ্জামিন ফার্নান্দোকে। তাঁর প্রশ্ন ছিল, শব্দের গতির প্রায় ৩০ গুণ বেগে নামা বস্তু যে শক-ওয়েভ তৈরি করে, তা কি ভূকম্প মাপার যন্ত্রে ধরা পড়ে? হ্যাঁ পারে। ফার্নান্দো ও তাঁর সহগবেষক কনস্টান্টিনোস চারালাম্বাস ২০২৪ সালের সেই ক্যালিফোর্নিয়ার ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করেন। শেনঝৌ-১৫ মিশনের একটি মডিউল পড়ার সময় ক্যালিফোর্নিয়া ও নেভাডার ১২৬টি ভূকম্প কেন্দ্র সেই শব্দতরঙ্গ রেকর্ড করে। তথ্যের প্যাটার্ন থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, এটা কোনও ভূমিকম্প নয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকৃত পতনের পথ পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে ছিল। তাই সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বাতাসে শক-ওয়েভের পথ বদলাতে পারে। আর যন্ত্র-বিরল এলাকায় এই পদ্ধতি কার্যকর করা কঠিন। তবু লক্ষ্যটা স্পষ্ট। আগামী পাঁচ বছরে এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরি করা, যা ভূকম্প উপাত্ত ব্যবহার করে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে মহাকাশ-জঞ্জালের পুনঃপ্রবেশ শনাক্ত করবে।
সূত্র: doi: 10.1126/science.zxqeufs
