
সৌরজগতের বাইরে থেকে আসা উচ্চ-শক্তির কণা, অর্থাৎ গ্যালাক্সি থেকে আসা মহাজাগতিক রশ্মি কিছু বরফ ঢাকা গ্রহ বা উপগ্রহে জীবনের সম্ভাব্য শক্তির উৎস হতে পারে। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব অ্যাস্ট্রোবায়োলজি–তে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, এই বিকিরণ ভূগর্ভস্থ জলের অণু ভেঙে এমন রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে পারে, যার উপজাতক অণুজীবকে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়ক। এই ধারণা, প্রচলিত বাসযোগ্য অঞ্চলের বাইরেও জীবনের অস্তিত্বের সম্ভাবনা উন্মোচন করছে। উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট জ্যাক অ্যাডাম (গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না) মন্তব্য করেছেন, “অপ্রচলিত বাসযোগ্যতা, বিশেষত বিকিরণের মাধ্যমে টিকে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে এখনো যথেষ্ট অনুসন্ধান হয়নি।” এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মূলত ধারণা করতেন, জীবনের অস্তিত্ব এমন সব গ্রহেই সম্ভব, যারা তাদের নক্ষত্রের কাছাকাছি থাকবে। যেখানে তরল বা জলের উপস্থিতি নিশ্চিত । কিন্তু আবুধাবির নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট দিমিত্রা আত্রি চরম অবস্থায় টিকে থাকা পৃথিবীর গভীর-স্থলজ জীব নিয়ে চিন্তা শুরু করেন। প্রায় তিন কিলোমিটার গভীরে পাওয়া এক ব্যাকটেরিয়া (Candidatus Desulforudis audaxviator) শুধুমাত্র তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট বিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে পারে। এই বিক্রিয়ায় জল ভেঙে বিভিন্ন উপাদান তৈরি হয়। তার মধ্যে একটি উপাদান ব্যাকটেরিয়াটিকে খাদ্য তৈরিতে সাহায্য করে। আত্রি এ আবিষ্কারকে “নতুন পথের দিশারী” বলে বর্ণনা করেছেন। কারণ এখানে বিকিরণ ক্ষতিকর না হয়ে জীবনের সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিকিরণকে আমরা কোষের পক্ষে ক্ষতিকারক বা ক্যানসারের ঝুঁকি হিসেবে জানি। কিন্তু অনেক জীব আবার বিকিরণ প্রতিরোধে অভিযোজিত হয়। যেমন, সূর্যের কম শক্তির রশ্মিতে মেলানিন উৎপাদন। আর ভূগর্ভস্থ জীবেরা সবচেয়ে ক্ষতিকর আন্তঃনাক্ষত্রিক রশ্মি থেকে প্রাকৃতিকভাবেই সুরক্ষিত থাকে। আত্রি ও তার সহকর্মীরা হিসাব করেছেন, মঙ্গল, বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা এবং শনি গ্রহের উপগ্রহ এনসেলাডাসে মহাজাগতিক রশ্মির মাধ্যমে কী পরিমাণ রাসায়নিক শক্তি তৈরি হতে পারে। এই তিন জগতেই ভূগর্ভস্থ জলের অস্তিত্বের সম্ভাবনা আছে এবং পাতলা বায়ুমণ্ডল সেই রশ্মিকে সহজে প্রবেশ করতে দেয়। তাদের সিমুলেশনে দেখা গেছে, এনসেলাডাসে ভূ-পৃষ্ঠের মাত্র ২ মিটার গভীরে যথেষ্ট এটিপি উৎপন্ন হতে পারে যা প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে প্রায় ৪২,৯০০ কোষকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। মঙ্গলে ০.৬ মিটার গভীরে প্রায় ১১,৬০০ কোষ বেঁচে থাকতে পারে। ইউরোপায় ১ মিটার গভীরে প্রায় ৪,২০০ কোষকে টিকিয়ে রাখার মতো শক্তি উৎপন্ন হতে পারে। আডিনোসিন ট্রাইফসফেট বা এটিপি হলো জীবনের সর্বজনীন শক্তি যোগানদার। কিছু ব্যাকটেরিয়া সরাসরি পরিবেশ থেকে ইলেকট্রন শোষণ করে এটিপি তৈরি করতে পারে। আত্রি বলেন, “এ আমাদের অনুসন্ধানের পরিসর অনেক বাড়িয়ে দিল। খুব ঠান্ডা গ্রহ, এমনকি নক্ষত্রহীন ভ্রাম্যমাণ গ্রহেও হয়তো জীবনের সম্ভাবনা রয়েছে।” গবেষকরা এই অঞ্চলটিকে রেডিওলাইটিক নিবাসযোগ্য অঞ্চল নাম দিয়েছেন। পরবর্তী ধাপে তিনি ল্যাবরেটরিতে এনসেলাডাস, ইউরোপা ও মঙ্গলের মতো পরিবেশ সিমুলেট করে পৃথিবীর চরম অবস্থায় টিকে থাকা জীবের আচরণ পর্যবেক্ষণ করার পরিকল্পনা করছেন। তবে পোল্যান্ডের শেজসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট ফ্রাঙ্কো ফেরারি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, শুধুমাত্র বিকিরণ হয়তো জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট নয়। সব জীবেরই জটিল জৈব অণুর প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে, গ্লুকোজের মতো কিছু যা মূলত সূর্যালোকের উপস্থিতিতেই গঠিত হয়। তাই রেডিওলাইটিক নিবাসযোগ্য অঞ্চলের জগতগুলোতে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে ভাবতে হবে গবেষকদের।
সূত্র : Estimating the potential of ionizing radiation-induced radiolysis for microbial metabolism on terrestrial planets and satellites with rarefied atmosphere by Dimitra Atri, et.al ; International Journal of Astrobiology(Vol 25) (28th July, 2025)