ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে একটি গুহার দেওয়ালে পাওয়া হাতের স্টেনসিল যেন মানব ইতিহাসের টাইমলাইনে বড়সড় ঝাঁকুনি। গবেষকদের দাবি, এটি এখনও পর্যন্ত পাওয়া বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো গুহাচিত্র। কমপক্ষে ৬৭,৮০০ বছরের পুরোনো। শুধু তাই নয়, এই হাতের ছবি আমাদের কল্পনা, প্রতীকী চিন্তা আর সৃজনশীলতার ইতিহাস নতুন করে লিখছে। ছবিটি আসলে একটি লাল রঙের হাতের ছাপ। প্রাচীন এক শিল্পী গুহার দেওয়ালে হাত চেপে ধরে রঙ ছিটিয়েছিলেন। মুখে রঙ নিয়ে ফুঁ দিয়ে বা থুথু ছিটিয়ে। হাত সরানোর পর দেয়ালে থেকে যায় তার ছায়া। কিন্তু এখানেই গল্প শেষ নয়। গবেষকদের মতে, এই হাতের আঙুলগুলো পরে ইচ্ছাকৃতভাবে বদলে দেওয়া হয়। চওড়া আঙুল সরু করা হয়েছে, লম্বা করা হয়েছে, যেন হাতটি নখরওয়ালা কোনো অদ্ভুত প্রাণীর মতো। এই ‘রূপান্তর’-ই আসল চমক। কারণ এটি নিছক হাতের ছাপ নয়, এটি ভাবনার কাজ, একটি প্রতীকী কল্পনার প্রকাশ। অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাডাম ব্রুম বলছেন, “এটা খুব মানবীয় কাজ। এখানে কেবল আঁকা নেই, সেটাকে আবার বদলাচ্ছি, সেটা দিয়ে গল্প তৈরি করছি।“ তাঁর মতে, এই বৈশিষ্ট্যই মানুষকে আলাদা করেছে। গুহাচিত্রটি পাওয়া গেছে মুনা দ্বীপের লিয়াং মেটানদুনো নামের একটি চুনাপাথরের গুহায়। যা দক্ষিণ-পূর্ব সুলাওয়েসির কাছে অবস্থিত। গুহার দেওয়ালে জমে থাকা খনিজ স্তর বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ছবিটির বয়স নির্ধারণ করেছেন, এটি অন্তত ৬৭,৮০০ বছরের পুরোনো। ফলে স্পেনের মালত্রাভিয়েসো গুহার বিতর্কিত হাতের ছাপও (৬৬,৭০০ বছর) পেছনে পড়ে গেল। যে ধারণা বলত, মানুষের শিল্পবোধ আর বিমূর্ত চিন্তার জন্ম হয়েছিল বরফযুগের ইউরোপে, প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে। ফ্রান্স ও স্পেনের বিখ্যাত আলতামিরা গুহাচিত্র এল কাস্তিলো দীর্ঘদিন ধরে ‘মানব মনের বিগ ব্যাং’ -এর প্রতীক ছিল। কিন্তু গত এক দশকে সুলাওয়েসি থেকে একের পর এক আবিষ্কার সেই ইউরোপ কেন্দ্রিক গল্পকে ভেঙে দিয়েছে। ২০১৪ সালে সুলাওয়েসিতে ৪০,০০০ বছরের বেশি পুরোনো হাতের ছাপ ও পশুচিত্র পাওয়া গিয়েছিল। পরে আসে ৪৪,০০০ বছরের পুরোনো শিকারদৃশ্য। এরপর মানুষ ও শূকরের গল্পধর্মী চিত্র, যার বয়স অন্তত ৫১,২০০ বছর। প্রতিটি আবিষ্কারই শিল্পের ইতিহাসকে আরও আদিম করে তুলছে। অধ্যাপক ম্যাক্সিম অবার্ট বলছেন, “প্রথমে এই চিত্র ইউরোপের সমসাময়িক মনে হচ্ছিল, কিন্তু রঙের কাছাকাছি গিয়ে কাল নির্ধারণ করায় আমরা সময়কে আরও ২৮,০০০ বছর পেছনে নিয়ে যেতে পেরেছি।” এই নতুন আবিষ্কার সুলাওয়েসির একেবারে অন্য প্রান্তে, মূল মারোস-পাংকেপ অঞ্চলের বাইরে। অর্থাৎ গুহাচিত্রটি নিছক কোনো স্থানীয় পরীক্ষানিরীক্ষা ছিল না, এ ছিল বিস্তৃত সাংস্কৃতিক চর্চা।একটি অঞ্চলের মানুষের গভীরে প্রোথিত অভ্যাস। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় গবেষণা সংস্থা ব্রিন-এর গবেষক অধি আগুস অক্টাভিয়ানা বলছেন, “এই তথ্য মানব অভিবাসনের ইতিহাসেও বড় ইঙ্গিত দেয়”। বহুদিন ধরে ধারণা ছিল, হোমো স্যাপিয়েন্স প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে অস্ট্রেলিয়া–নিউ গিনি ভূখণ্ডে (প্রাচীন সাহুল) পৌঁছায়। কিন্তু যদি সুলাওয়েসিতে ৬৭,৮০০ বছর আগেই মানুষ জটিল প্রতীকী শিল্প তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে অস্ট্রেলিয়ায় ৬৫,০০০ বছর পুরোনো মানব উপস্থিতির প্রমাণ আর এতটা বিতর্কিত থাকে না। সুলাওয়েসি ছিল মূল এশিয়া থেকে সাহুলে যাওয়ার উত্তরের সমুদ্রপথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তাই এখানে পাওয়া শিল্পকর্ম শুধু সৌন্দর্যের নিদর্শন নয়, এটি এক যাত্রাপথের সাইনবোর্ড। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লম্বোস গুহা থেকে ৭০,০০০–১,০০,০০০ বছরের পুরোনো খোদাই করা আখর, পুঁতি আর বিমূর্ত চিহ্ন দেখিয়ে দিয়েছিল, প্রতীকী চিন্তা আফ্রিকাতেই জন্মেছিল, ইউরোপে নয়। সুলাওয়েসির এই হাত সেই কাহিনীকে আরও জোরালো করে। সব মিলিয়ে, নতুন এক বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে। মানুষের সৃজনশীলতা কোনো হঠাৎ বিস্ফোরণ নয়, কোনো এক মহাদেশে সীমাবদ্ধ ঘটনা নয়। এটি ছিল আমাদের প্রজাতির ভেতরে জন্মানো এক গভীর ক্ষমতা। যা আমরা আফ্রিকা ছাড়ার আগেই বহন করছিলাম, আর পৃথিবীর নানা প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ালে, রঙে আর গল্পে লিখে ফেলছিলাম।
সূত্র: Oldest cave painting of red claw hand could rewrite human creativity timeline; BBC
